শারদোৎসব মানেই শুধু দেবী দুর্গার আরাধনা নয়, বাঙালির শিল্পবোধ, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক বার্তারও এক অনন্য প্রকাশ। সেই ঐতিহ্যকে নতুন ভাবনায় সামনে এনে ৭৩তম বর্ষে বাগুইআটি রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের দুর্গাপুজো এবার বেছে নিয়েছে বিশেষ এক থিম—‘Collage’। আর এই ভাবনার অন্যতম আকর্ষণ, পুনর্ব্যবহৃত সংবাদপত্র দিয়ে তৈরি দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল।
উৎসবের আবহে খবরের কাগজ সাধারণত দিনের সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম। কিন্তু বাগুইআটি রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের ভাবনায় সেই পুরনো সংবাদপত্রই এবার হয়ে উঠেছে শিল্পসৃষ্টির উপকরণ। ব্যবহৃত কাগজকে নতুন রূপ দিয়ে তৈরি হয়েছে পুজোমণ্ডপ, যেখানে শিল্প, পরিবেশ সচেতনতা এবং দুর্গোৎসবের আবেগ একসূত্রে মিলেছে।
‘Collage’ শব্দের মধ্যেই রয়েছে নানা উপাদানকে একত্র করে নতুন একটি দৃশ্যভাষা তৈরি করার ধারণা। সেই ভাবনাকেই প্যান্ডেলের নকশায় তুলে ধরা হয়েছে। পুরনো সংবাদপত্রের স্তর, টেক্সট, ছবি এবং কাগজের বৈচিত্র্য মিলিয়ে মণ্ডপ পেয়েছে স্বতন্ত্র চরিত্র।

৭৩ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় এই পুজো ইতিমধ্যেই স্থানীয় উৎসবের পরিসরে একটি পরিচিত নাম। এবারের থিম সেই ধারাবাহিকতার সঙ্গে সমকালীন পরিবেশ ভাবনাকে যুক্ত করেছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ব্যবহার দর্শনার্থীদের সামনে উৎসবের মধ্যেই টেকসই জীবনযাপনের একটি বার্তাও তুলে ধরে।
‘Collage’ থিমে সংবাদপত্রের নতুন শিল্পরূপ
পুরনো সংবাদপত্র দিয়ে প্যান্ডেল তৈরির ভাবনাটি একদিকে যেমন অভিনব, অন্যদিকে তেমনই অর্থবহ। প্রতিদিনের ব্যবহারের পর যে কাগজ সাধারণত ফেলে দেওয়া হয়, সেটিকেই শিল্পের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
মণ্ডপসজ্জায় সংবাদপত্রের ভাঁজ, কাটিং, স্তরবিন্যাস এবং বিভিন্ন ছাপা অংশের সমন্বয় ‘Collage’-এর মূল ভাবনাকে দৃশ্যমান করে। ফলে প্যান্ডেলটি শুধু একটি কাঠামো নয়, বরং পুনর্ব্যবহার ও সৃজনশীলতার মিলিত এক শিল্পপ্রয়াস।
এখানে পুরনো কাগজের নিজস্ব টেক্সচারই হয়ে উঠেছে সাজসজ্জার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ বর্জ্য কমানো, পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব দুর্গাপুজোর ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসে।

৭৩তম বর্ষে ঐতিহ্য ও পরিবেশ সচেতনতার মেলবন্ধন
দুর্গাপুজোর মতো বৃহৎ উৎসবে পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার এখন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাগুইআটি রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের এবারের আয়োজন সেই পরিবর্তিত ভাবনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঐতিহ্যকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছে।

৭৩তম বর্ষের এই পুজোয় তাই একদিকে রয়েছে দেবী দুর্গার চিরন্তন আরাধনা, অন্যদিকে রয়েছে আধুনিক শিল্পভাবনা। সংবাদপত্রের মতো পরিচিত উপাদানকে কেন্দ্র করে তৈরি প্যান্ডেল দর্শনার্থীদের কাছে উৎসবের অভিজ্ঞতাকে আরও আলাদা করে তুলতে পারে।
‘Collage’ থিমের মাধ্যমে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন উপাদানকে একত্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পরূপ দেওয়ার যে ধারণা, সেটিই এই পুজোর মূল আকর্ষণগুলির একটি। পুরনোকে নতুনভাবে দেখার এই প্রয়াসই এবারের মণ্ডপসজ্জাকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে।
সংবাদপত্র থেকে প্যান্ডেল: উৎসবের আঙিনায় পুনর্ব্যবহারের বার্তা
বাগুইআটির এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু তার দৃশ্যমান নান্দনিকতায় নয়; এর ভাবনার মধ্যেও রয়েছে একটি সামাজিক বার্তা। সংবাদপত্রের পুনর্ব্যবহার দেখিয়ে আয়োজকেরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, সৃজনশীলতার মাধ্যমে পরিত্যক্ত বা ব্যবহৃত সামগ্রীও নতুন জীবন পেতে পারে।
দুর্গাপুজো বরাবরই বাঙালির শিল্প ও সংস্কৃতির অন্যতম বড় মঞ্চ। সেই মঞ্চে পরিবেশবান্ধব চিন্তাকে জায়গা দেওয়া উৎসবের বার্তাকে আরও বিস্তৃত করে। ‘Collage’ তাই এখানে কেবল একটি শিল্পধারা নয়—বিভিন্ন ভাবনা, উপকরণ ও মূল্যবোধকে একত্রিত করার প্রতীক।‘Collage’ থিমে সংবাদপত্রের নতুন শিল্পরূপ

বাগুইআটি রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের ৭৩তম দুর্গাপুজোয় ‘Collage’ থিমে পুনর্ব্যবহৃত সংবাদপত্রের প্যান্ডেল নিঃসন্দেহে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অভিনব সংযোগ তুলে ধরে। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি পরিবেশ সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াস শারদোৎসবের সাংস্কৃতিক পরিসরকে আরও সমৃদ্ধ করে। কাগজের পুরনো পাতায় তাই এবার লেখা হচ্ছে নতুন এক দুর্গোৎসবের গল্প।








