SIR বা Special Intensive Revision ঘিরে নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্র করে চলা বিতর্কে বৃহস্পতিবার নতুন মোড়। তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়ে FIR নথিভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। তবে এখনও পর্যন্ত পুলিশ FIR নথিভুক্ত করেনি।
মহুয়ার অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন, SIR প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, Form 6-এ পরিবর্তন এবং নির্বাচন কমিশনের IT ব্যবস্থার কেন্দ্রীভূত ব্যবহারের মতো একাধিক বিষয়। তাঁর দাবি, এই পদক্ষেপগুলির কয়েকটি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই সদস্য—সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী—আপত্তি তুলেছিলেন।
এই অভিযোগের সূত্র হিসেবে মহুয়া সাম্প্রতিক একটি সংবাদ প্রতিবেদনের উল্লেখ করেছেন। সেই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সান্ধু ও যোশী ভোটার সংযোজন, নাম বাদ দেওয়া, পুনর্বহাল এবং ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া-সহ বিভিন্ন সিদ্ধান্তে অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, লিখিত নোট, পর্যবেক্ষণ বা অভ্যন্তরীণ মতামত প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার স্বাভাবিক অংশ। কমিশনের দাবি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি যথাযথ প্রক্রিয়ায় এবং সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে। ফলে মহুয়ার অভিযোগ এবং কমিশনের বক্তব্য—দুই ভিন্ন অবস্থানকে ঘিরেই এখন SIR বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
SIR ও ভোটার তালিকা নিয়ে কী অভিযোগ মহুয়ার?

মহুয়া মৈত্রের অভিযোগের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ভোটার তালিকার ব্যবস্থাপনা। তাঁর দাবি, নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় IT ব্যবস্থা ব্যবহার করে মাঠপর্যায়ের Electoral Registration Officer বা ERO এবং Booth Level Officer বা BLO-দের ভূমিকা ও অ্যাক্সেসকে পাশ কাটানো হয়েছে।
মহুয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে স্থানীয় স্তরের আধিকারিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু SIR-সংক্রান্ত কিছু ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীভূত সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে তাঁদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সীমিত করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।
তবে এই অভিযোগগুলি এখনও অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে। এগুলি প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নির্বাচন কমিশন বরং বলেছে, তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে।
SIR-এর উদ্দেশ্য হিসেবে ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধনকে সামনে রাখা হলেও, নাম বাদ পড়া, পুনরায় অন্তর্ভুক্তি এবং আপিলের প্রক্রিয়া নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যেই বড় প্রশাসনিক চাপ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে SIR-পরবর্তী ভোটার তালিকা নিয়ে লক্ষ লক্ষ আপিল জমা পড়েছে।
Form 6 নিয়ে প্রশ্ন, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই অভিযোগ?
নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্তির ক্ষেত্রে Form 6 একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। মহুয়া মৈত্রের অভিযোগ, SIR-এর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অতিরিক্ত প্রশ্ন এই ফর্মে যুক্ত করা হয়েছিল এবং সেই পরিবর্তনের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরেই আপত্তি উঠেছিল।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী Form 6-এ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য হিসেবে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বিধি সংশোধন ছাড়া একটি statutory form পরিবর্তন করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল।
এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ ভোটার তালিকায় নতুন নাম অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া সরাসরি নাগরিকের ভোটাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। Form 6-এর কোনও পরিবর্তন হলে তার আইনি ভিত্তি, প্রশাসনিক নির্দেশ এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের পদ্ধতি—সবকিছুই স্বচ্ছ থাকা প্রয়োজন।
মহুয়ার দাবি, Form 6 নিয়ে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও পরিবর্তন কার্যকর করা হয়েছিল। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। কমিশন জোর দিয়ে বলেছে, তাদের আনুষ্ঠানিক আদেশ ও সিদ্ধান্তের আইনি বৈধতা রয়েছে।
FIR-এর দাবি ও সামনে আইনি প্রশ্ন
মহুয়া মৈত্র শুধু অভিযোগ জমা দিয়েই থামেননি। তিনি পুলিশি তদন্ত এবং FIR নথিভুক্ত করার দাবি তুলেছেন। অভিযোগে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত, ভোটার তালিকা ব্যবস্থাপনা এবং কমিশনের IT ব্যবস্থার ব্যবহার খতিয়ে দেখার আবেদন করা হয়েছে।
তবে অভিযোগ জমা পড়া এবং FIR নথিভুক্ত হওয়া একই বিষয় নয়। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় অভিযোগ জমা পড়লেও পুলিশ তখনও FIR নথিভুক্ত করেনি।
মহুয়া তাঁর অভিযোগে Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners Act, 2023-এর Section 16-এর প্রসঙ্গও তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইন যে সুরক্ষা দেয়, তা সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত যদি আইনবহির্ভূত হয়ে থাকে বলে অভিযোগ ওঠে, তাহলে কীভাবে প্রযোজ্য হবে—সেটিও তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান হল, কমিশনের অভ্যন্তরীণ নোট ও মতামত প্রাতিষ্ঠানিক deliberation-এর অংশ এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামোই প্রযোজ্য। ফলে FIR-এর দাবির পরবর্তী পর্বে আইনি ব্যাখ্যাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
SIR বিতর্কে পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
মহুয়া মৈত্রের অভিযোগের পর এখন নজর পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। FIR নথিভুক্ত হলে অভিযোগে উত্থাপিত বিষয়গুলি নিয়ে তদন্তের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তবে FIR না হলে অভিযোগের আইনি গতিপথ অন্যভাবে এগোতে পারে।
একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন থাকছে। দুই নির্বাচন কমিশনারের কথিত আপত্তি এবং কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ছিল—এই দুই বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্যই বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে SIR-পরবর্তী ভোটার তালিকা নিয়ে বিপুল সংখ্যক আপিল জমা পড়ায় প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপরও নজর রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে, বাদ পড়া ভোটারদের একটি বড় অংশ পুনরায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করেছেন।
অতএব, মহুয়া মৈত্রের অভিযোগকে ঘিরে বিতর্ক শুধু একজন সাংসদ বনাম একজন নির্বাচন কমিশনারের বিষয় হয়ে থাকছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, নাগরিকের ভোটাধিকার, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং নির্বাচন ব্যবস্থার প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মতো বৃহত্তর প্রশ্ন।
SIR বিতর্কে মহুয়া মৈত্রের পুলিশ অভিযোগ নতুন করে আইনি মাত্রা যোগ করেছে। ভোটার তালিকা, Form 6, কেন্দ্রীভূত IT ব্যবস্থা এবং নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে তাঁর অভিযোগের বিপরীতে কমিশনও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
এখন মূল নজর থাকবে FIR নথিভুক্ত হয় কি না, অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও তদন্ত শুরু হয় কি না এবং সংশ্লিষ্ট নথি ও সিদ্ধান্তের আইনি মূল্যায়ন কীভাবে হয় তার দিকে। একই সঙ্গে SIR-পরবর্তী ভোটার তালিকা সংশোধন ও আপিলের প্রক্রিয়াও এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।







