পূজা আসতে আর

Days
Hours
Minutes
Seconds

বাকি।

প্রেমের কি কোনও লেবেল হয়? অটিজম ও ডাউন সিনড্রোমকে ঘিরে সম্পর্কের নতুন প্রশ্ন তুলছে ‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’

কলকাতা, ৮ আগস্ট: প্রেম কি শুধুই তথাকথিত ‘স্বাভাবিক’ মানুষের অধিকার? অটিজম বা ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত একজন মানুষ কি প্রেমে পড়তে পারেন? তাঁরা কি বিয়ে, সংসার কিংবা নিজের মতো করে একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারেন? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সেই ভালোবাসা ও ইচ্ছেকে কি সমাজ একই মর্যাদায় গ্রহণ করতে প্রস্তুত?

এই প্রশ্নগুলিই সামনে নিয়ে আসছে বাংলা শর্ট ফিল্ম ‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’। প্রেমের প্রচলিত সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে তৈরি এই ছবিটি অটিজম ও ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত মানুষের আবেগ, সম্পর্ক, স্বপ্ন, আত্মপরিচয় এবং সামাজিক মর্যাদার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে।


সহানুভূতির নয়, মর্যাদার গল্প

সমাজে এখনও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের নিয়ে একাধিক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেক সময় তাঁদের ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে চিহ্নিত করে মূলস্রোত থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। অথচ তাঁদেরও রয়েছে অনুভূতি, ভালো লাগা, স্বপ্ন এবং নিজের মতো করে জীবন বেছে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’ সেই জায়গাটিকেই নতুন করে দেখতে চায়। ছবিটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের শুধুমাত্র সহানুভূতির চোখে দেখার পরিবর্তে তাঁদের আবেগ, সম্পর্ক এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছে।

অর্থাৎ, গল্পের কেন্দ্রে শুধু প্রেম নেই—আছে গ্রহণযোগ্যতা, সমতা এবং মর্যাদার প্রশ্নও


আমিকার অভিনয়ে বাস্তবতার ছোঁয়া

ছবিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ আমিকা ভট্টাচার্য। তিনি নিজেও ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত এক তরুণী এবং ছবিতে তাঁর অভিনয় গল্পটিকে দিয়েছে একটি বিশেষ মাত্রা।

স্বাভাবিক অভিনয়, অভিব্যক্তি এবং আবেগের প্রকাশে আমিকা চরিত্রটিকে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন বলে নির্মাতাদের দাবি। কলকাতা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত টিজার প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শক ও অতিথিদের কাছ থেকেও তাঁর অভিনয় প্রশংসা পেয়েছে।

তাঁর অংশগ্রহণ শুধুমাত্র অভিনয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদেরও যে নিজেদের প্রতিভা প্রকাশের জন্য যথাযথ সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন, আমিকার উপস্থিতি সেই বার্তাটিকেও সামনে নিয়ে আসে।


পুরুষ চরিত্রে আমন

ছবির পুরুষ প্রধান চরিত্রে রয়েছেন আমন। এর আগে তাঁকে Netflix-এর জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ Khakee এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত শর্ট ফিল্ম Payesh-এ অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে।

পূর্ববর্তী কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’-এ আমনের অভিনয়ও দর্শকদের কাছে আলাদা মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করছেন নির্মাতারা।


প্রেমের গল্পের আড়ালে বড় সামাজিক প্রশ্ন

নির্মাতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’ শুধুমাত্র একটি রোম্যান্টিক শর্ট ফিল্ম নয়। বরং ছবিটির মূল উদ্দেশ্য সমাজের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা।

কেবল কোনও মানুষ অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা বলেই কি তাঁর প্রেমে পড়ার অধিকার থাকবে না? তিনি কি সম্পর্ক তৈরি করতে পারবেন না? বিয়ে কিংবা নিজের মতো করে একটি স্বাধীন ও পরিপূর্ণ জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখার অধিকার কি তাঁর নেই?

ছবিটি এই প্রশ্নগুলির সরাসরি উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করতে চায়। একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্তি, সহমর্মিতা, সমতা, মর্যাদা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করাই নির্মাতাদের অন্যতম লক্ষ্য।


কলকাতা প্রেস ক্লাবে প্রকাশ পেল টিজার

৭ আগস্ট ২০২৬ কলকাতা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ করা হয় ‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’-এর টিজার। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি একাধিক বিশিষ্ট অতিথি।

উপস্থিত ছিলেন প্যারানরমাল গবেষক ড. উজ্জ্বল গুপ্ত, শিশু ও নারী সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ ড. সোমা গোয়াল, ফ্যাশন ডিজাইনার শান্তনু গুহ ঠাকুরতা, মডেল উপেন, নবাগতা অভিনেত্রী আয়ুশ্রী পাল, অভিনেতা আমন, ড. সুনীপা রায়, সল্টলেক উত্তরায়ণের প্রতিষ্ঠাতা, প্রিন্সিপাল শম্পা দে শ্রীনিবাসন এবং স্পেশাল এডুকেটর কৌশিক পাল-সহ আরও অনেকে।

টিজার প্রকাশের পর অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিশেষ করে বাংলা সিনেমায় তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত এমন একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ছবি তৈরির উদ্যোগ প্রশংসিত হয়। আমিকার স্বাভাবিক অভিনয়ও উপস্থিত অনেকের নজর কেড়েছে।


বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের অভিভাবকদের জন্য আশার বার্তা

ছবিটির পরিচালক Soumen D.-এর মতে, এই ছবির অন্যতম উদ্দেশ্য হল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের বাবা-মায়ের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি বাড়ানো।

নির্মাতাদের বার্তা স্পষ্ট—সঠিক সুযোগ, উৎসাহ এবং সহায়তা পেলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরাও অন্য কারও থেকে কম সক্ষম নয়। নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরে তাঁরা সমাজে নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করতে পারেন।

এই বার্তাটি ছবিটিকে শুধুমাত্র একটি প্রেমের গল্পের মধ্যে আটকে রাখে না। বরং পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তাও পৌঁছে দেয়।


আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পথে

‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’-এর আন্তর্জাতিক যাত্রার প্রস্তুতিও ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। নির্মাতারা জানিয়েছেন, ছবিটি একাধিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের পর ছবিটি সাধারণ দর্শকদের জন্য মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।


কারা রয়েছেন ছবির নেপথ্যে?

‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’-এর প্রযোজক পরিমল ভট্টাচার্য। ছবির গল্প ও পরিচালনায় রয়েছেন Soumen D.। সহ-পরিচালনা ও সিনেমাটোগ্রাফির দায়িত্ব সামলেছেন তপস ব্যানার্জি এবং সম্পাদনার দায়িত্বে রয়েছেন Sayanhya D.। ছবিতে অভিনয় করেছেন পরিমল ভট্টাচার্য, মন্তু ভট্টাচার্য, আমন এবং আমিকা ভট্টাচার্য। পুরো টিজার লঞ্চ অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেছেন শ্রাবণী বসু।
‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’ শেষ পর্যন্ত কতটা দর্শকের মন ছুঁতে পারে, তা সময়ই বলবে। তবে ছবিটি যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, তা স্পষ্ট—ভালোবাসার কি সত্যিই কোনও লেবেল প্রয়োজন?

সমাজ যখন এখনও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের জীবনকে অনেক সময় করুণা বা সুরক্ষার দৃষ্টিতে দেখে, তখন তাঁদের ভালোবাসা, সম্পর্ক এবং নিজের মতো করে জীবন বেছে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে গল্পের কেন্দ্রে নিয়ে আসা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আর সেই কারণেই ‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’ শুধু একটি শর্ট ফিল্ম নয়, বরং আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন করে দেখার একটি আমন্ত্রণ।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
Email
Print
আরও পড়ুন
error: Content is protected !!