কলকাতার পূর্ব প্রান্তে বিস্তৃত ধাপার বর্জ্যভূমি বহু বছর ধরে শহরের সমস্ত বর্জ্য সামলে এসেছে। কিন্তু এই আবর্জনার পাহাড়ের মাঝেই রয়েছে মানুষের বাসস্থান—এক সম্প্রদায় যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে বসবাস করে এসেছে। আজ সেই মানুষগুলোকেই লড়াই করতে হচ্ছে সবচেয়ে মৌলিক অধিকার—নিজেদের পরিচয় প্রমাণ করতে। জমির মালিকানা নেই, ঠিকানা নেই, সরকারি নথি নেই—তার ফলে সরকারি সুবিধা থেকে স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা—সবই হয়ে উঠেছে বিলাসিতা। এই প্রতিবেদন সেই সংগ্রাম, সংকট ও বাস্তবতার গল্প।
ধাপা ঢিপির মানুষের পরিচয়ের লড়াই: নথি নেই, অধিকার নেই
পূর্ব কলকাতার এই অঞ্চলটি মূলত শহরের বর্জ্য নিষ্কাশনের কেন্দ্র। ধাপার বর্জ্য পাহাড় যতটা কুখ্যাত, তার চেয়েও বড় সমস্যা লুকিয়ে রয়েছে তার আশেপাশের বস্তির বাসিন্দাদের জীবনে। যাদের অধিকাংশই রঘুনাথপুর, ক্যানাল সাইড বা নিম্ন আয়ের বসতি থেকে এসেছে, তারা বহু দশক ধরে এখানে বাস করলেও তাদের পরিচয় এখনো ‘অস্থায়ী’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সরকারি নথি যেমন রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, আধার—সব ক্ষেত্রেই স্থায়ী ঠিকানা প্রয়োজন। ধাপার বস্তিবাসীদের জন্য সেটাই সবচেয়ে বড় বাধা। ঠিকানা না থাকায় তারা সরকারি কোনও সুবিধা পান না। ফলে পুষ্টিকর খাবার, স্বাস্থ্যের পরিষেবা, শিক্ষা—এর সবথেকে বেসিক সুবিধাগুলো থেকেও তারা বঞ্চিত।

মানুষের কাছে পরিচয়ের অভাব মানে সমাজে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। কেউ মারা গেলে মৃত্যুর নথি নেই, সন্তান জন্মালে জন্ম সার্টিফিকেট তৈরি করা কঠিন, চাকরি পেতে গেলে ঠিকানা না থাকায় সুযোগ হাতছাড়া।
সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কাছে তারা আজও ‘অচেনা’ জনগোষ্ঠী।
বর্জ্যভূমির উপর জীবন: স্বাস্থ্যঝুঁকি, অনিশ্চয়তা, এবং প্রতিদিনের সংগ্রাম
ধাপায় বসবাসকারীদের জীবন বেঁচে থাকার লড়াই। প্রতিদিনই তারা বিষাক্ত গ্যাস, ধোঁয়া এবং বর্জ্যের স্তূপের মাঝে জীবন যাপন করে। এর সঙ্গে যোগ হয় নথির অভাবজনিত অসুবিধা—যা তাদের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত ও দুর্বিষহ করে তোলে।
১. স্বাস্থ্যঝুঁকি
ধাপার আবর্জনার পাহাড় থেকে নির্গত মিথেন, বিষাক্ত গ্যাস এবং দুর্গন্ধ দিনে দিনে মানুষের শ্বাসযন্ত্রের ক্ষতি করে। শিশুদের মধ্যে হাঁপানি, ত্বকের রোগ, অ্যালার্জি ও নিউমোনিয়া প্রায়ই দেখা যায়।
হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে গেলে নথির অভাব আবারও সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
২. শিক্ষা
অনেক শিশুই স্কুলে ভর্তি হতে পারে না কারণ ঠিকানা প্রমাণপত্র নেই। ফলে শিশুশ্রম বেড়ে যায়, শিক্ষার হার কমে যায়।
৩. জীবিকা
অনেকেই বর্জ্য সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু পরিচয়পত্র না থাকায় তারা সরকারি স্কিম যেমন PMAY, রেশন, স্বাস্থ্যবিমা—এসবের সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

সরকারি উদ্যোগ ও বাস্তবতার ফাঁক: সংকট কি সত্যিই সমাধানযোগ্য?
সরকার একাধিকবার ধাপার বস্তিগুলিকে পুনর্বাসনের কথা বলেছে। কিছু এনজিওও কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়—
বহু পরিবারই পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় নথি দিতে পারে না। ফলে তারা তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়।
কেউ কেউ বলে—“আমাদের জন্য আশ্বাস আসে, কিন্তু সমাধান আসে না।”
এখানে আরেকটি সমস্যা হচ্ছে জমির মালিকানা না থাকা। রাষ্ট্রীয় নথিতে এদের বাসস্থান স্বীকৃত নয়, তাই তাদের পুনর্বাসন আইনি জটিলতার মধ্যে পড়ে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন বাসিন্দাদের অসুবিধা দূর করতে উদ্যোগ নিয়েছে—যেমন অস্থায়ী ঠিকানাভিত্তিক পরিচয় প্রদান, স্বাস্থ্য ক্যাম্প, শিক্ষা সহায়তা ইত্যাদি। তবুও সমস্যার মূলে থাকা আইননির্ভর ঠিকানা প্রমাণ এখনো অমীমাংসিত।
উপসংহার: মানবিকতার জায়গা থেকে স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন
ধানাপা ঢিপির মানুষেরা শুধু পরিচয় হারাচ্ছেন না—তারা ইতিহাসের খাতায়ও অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন।
একটি দেশের নাগরিক হয়েও তারা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।
এই পরিচয় সংকট কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক, মানবিক ও নৈতিক প্রশ্ন।
এই সমস্যা সমাধান করতে হলে প্রয়োজন—
- অস্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ পরিচয় নীতি
- পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে নথির নিয়ম সহজীকরণ
- শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষামূলক সহায়তা
- স্বাস্থ্য পরিষেবার সরলীকৃত প্রবেশ
সচেতনতা, প্রশাসনিক সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়া এই পরিচয় সংকট দূর হবে না।






