জগন্নাথদেবের স্নান যাত্রা: ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য উৎসব

জগন্নাথদেবের স্নান যাত্রা: ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য উৎসব

জয় জগন্নাথ। 🙏

স্নান যাত্রা, যা দেব স্নান পূর্ণিমা নামেও পরিচিত, ওড়িশার পুরীর শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের অন্যতম প্রাচীন ও তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। হিন্দু পঞ্জিকার জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। এই দিন ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা ও সুদর্শন চক্র-কে মহাসমারোহে স্নান করানো হয় এবং তাঁরা ভক্তদের দর্শনের জন্য জনসমক্ষে আসেন।

জগন্নাথদেবের স্নান যাত্রা: ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য উৎসব

স্নান যাত্রার উৎপত্তি

প্রাচীন স্কন্দ পুরাণ-এ স্নান যাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন শ্রীজগন্নাথের কাঠের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার পর এই স্নানোৎসবের সূচনা করেন।

লোককথায় বলা হয়, ভগবান জগন্নাথ নিজেই ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যে তিনি বছরে অন্তত একদিন সকল ভক্তের দর্শন দেবেন। কারণ অনেক ভক্ত বিভিন্ন কারণে মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে পারেন না। সেই ভাবনা থেকেই আজও এই ঐতিহ্য অটুট রয়েছে।

জগন্নাথদেবের স্নান যাত্রা: ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য উৎসব

স্নান যাত্রার রীতি ও তাৎপর্য

স্নান পূর্ণিমার দিনে দেবতাদের ‘পাহান্ডি’ নামে পরিচিত এক বিশেষ শোভাযাত্রার মাধ্যমে গর্ভগৃহ থেকে স্নান বেদি-তে আনা হয়। এই স্নান বেদি মূল মন্দিরের বাইরে অবস্থিত, যাতে অসংখ্য ভক্ত একসঙ্গে এই মহোৎসবের সাক্ষী হতে পারেন।

এরপর ১০৮টি পবিত্র কলসের জল দিয়ে দেবতাদের মহাস্নান করানো হয়। এই জল মন্দিরের স্বর্ণ কূপ (সোনা কুয়া) থেকে সংগ্রহ করা হয় এবং তাতে চন্দন, হলুদ, তুলসী, বিভিন্ন ভেষজ, সুগন্ধি ফুলসহ নানা পবিত্র উপাদান মেশানো হয়।

এই স্নান কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, পবিত্রতা ও ঈশ্বরের আশীর্বাদের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।

জগন্নাথদেবের স্নান যাত্রা: ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য উৎসব

গজবেশ বা হাতি বেশ

মহাস্নানের পর ভগবান জগন্নাথ ও বলভদ্রকে গজবেশ (হাতি বেশ)-এ সজ্জিত করা হয়। এই বিশেষ রূপকে গণেশের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। একই সঙ্গে এটি বৈষ্ণব, শৈব ও লোকায়ত সংস্কৃতির এক অনন্য সমন্বয়ের নিদর্শন, যা জগন্নাথ সংস্কৃতির সর্বজনীন ভাবধারাকে তুলে ধরে।

জগন্নাথদেবের স্নান যাত্রা: ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য উৎসব

স্নানের পর ‘অনসর’ পর্ব

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাস্নানের পর দেবতারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই তাঁরা প্রায় ১৫ দিন জনদর্শন থেকে বিরত থাকেন, যা ‘অনসর’ নামে পরিচিত। এই সময় তাঁদের বিশেষ ভেষজ সেবা ও চিকিৎসা করা হয়। এরপর নবযৌবন রূপে আবির্ভূত হয়ে তাঁরা বিখ্যাত রথযাত্রা-য় অংশগ্রহণ করেন।

জয় জগন্নাথ!

স্নান যাত্রা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি ভক্তি, ঐতিহ্য, সমতা ও সর্বজনীনতার এক চিরন্তন প্রতীক। যুগের পর যুগ ধরে এই মহোৎসব লক্ষ লক্ষ ভক্তের হৃদয়ে আধ্যাত্মিক আনন্দ ও বিশ্বাসের আলো জ্বালিয়ে রেখেছে।

(তথ্যসূত্র: স্কন্দ পুরাণ, শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের প্রচলিত ঐতিহ্য ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থের ভিত্তিতে সংকলিত।)

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
Email
Print
আরও পড়ুন
error: Content is protected !!