বই—শুধু কাগজে ছাপা কিছু শব্দ নয়, অনেকের কাছেই এটি শৈশবের প্রথম কল্পনার দরজা। একটি গল্পের কয়েকটি লাইন, সঙ্গে রঙিন ছবি—আর মুহূর্তেই খুলে যায় অন্য এক পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে অসম্ভবও সম্ভব, চরিত্ররা হয়ে ওঠে বন্ধু, আর ছোট্ট পাঠক নিজের মতো করে তৈরি করে নেয় এক বিশাল কল্পলোক।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে, বিশেষ করে AI-নির্মিত ছবি ও ডিজিটাল কনটেন্টের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির মধ্যে, বইয়ের সেই স্বতন্ত্র জাদুকে ধরে রাখার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সেই আবহেই ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ Ketab-E-এর উদ্যোগে প্রকাশ পেল তিনটি সুন্দর বাংলা শিশুতোষ গল্পের বই—‘কি মজা!’, ‘গল্পে ছবিতে উৎসব’ এবং ‘তাতার গল্প’।
তিনটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান তাই নিছক বই প্রকাশের আয়োজন হয়ে থাকেনি। শব্দ, গল্প, ছবি ও শিশুদের সৃজনশীলতাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিল শৈশবের কাছে ফিরে যাওয়ার এক উষ্ণ উপলক্ষ। সেখানে বই ছিল যেমন মূল আকর্ষণ, তেমনই ছিল কল্পনাশক্তি ও অন্তর্ভুক্তির এক সুন্দর বার্তা।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সৃজনশীলতাকে সামনে নিয়ে আসার প্রয়াস। এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়—প্রতিভার কোনও নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। প্রত্যেক শিশুর মধ্যেই রয়েছে নিজস্ব ভাবনা, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিজের মতো করে পৃথিবীকে দেখার ক্ষমতা।
‘কি মজা!’—সৃজনশীলতার কোনও সীমা নেই
‘কি মজা!’ বইটির বিশেষত্ব আরও গভীর। বইটির গল্প লিখেছেন শিক্ষাবিদ ও জনপ্রিয় গল্পকথক সুদেষ্ণা মৈত্র, যিনি শিশুদের কাছে স্নেহের ‘গল্প দিদা’ নামে পরিচিত। বইটির অলংকরণে নিজেদের সৃজনশীলতার ছাপ রেখেছেন দুই প্রতিভাবান তরুণ—অভিজ্ঞান নিয়োগী এবং বৈদুর্য বক্সী।

তাঁদের শিল্পকর্ম প্রমাণ করে, ছবি শুধু গল্পকে সাজায় না—অনেক সময় ছবিই গল্পের আরেকটি ভাষা হয়ে ওঠে। শিশুদের কল্পনা, অনুভূতি ও পর্যবেক্ষণশক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি এই বই তাই প্রকাশনার গণ্ডি পেরিয়ে এক ইতিবাচক সামাজিক বার্তাও বহন করে।
‘গল্পে ছবিতে উৎসব’ ও ‘তাতার গল্প’-এ শব্দ ও ছবির মেলবন্ধন
প্রকাশিত অন্য দুই বই ‘গল্পে ছবিতে উৎসব’ এবং ‘তাতার গল্প’-ও শিশু পাঠকদের জন্য তৈরি করেছে আলাদা আলাদা কল্পনার দরজা। বিশিষ্ট লেখকদের কলমে লেখা এই গল্পগুলিতে শব্দের সঙ্গে ছবির মেলবন্ধন ছোট পাঠকদের গল্পের ভিতরে আরও সহজে প্রবেশ করার সুযোগ তৈরি করে।

শিশুদের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে এমন বইয়ের গুরুত্ব যথেষ্ট। গল্প পড়ার মাধ্যমে ভাষার সঙ্গে পরিচয় যেমন বাড়ে, তেমনই তৈরি হয় প্রশ্ন করার অভ্যাস, কল্পনা করার ক্ষমতা এবং নিজের মতো করে কোনও ঘটনাকে বোঝার সুযোগ। বাংলা শিশু সাহিত্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এমন প্রকাশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বই প্রকাশের আড়ালে শৈশবে ফিরে যাওয়ার গল্প
Ketab-E-এর এই আয়োজনের সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এখানেই—এটি শুধু তিনটি বই প্রকাশের ঘটনা নয়, বরং বইকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক আবেগের পুনরাবিষ্কার। এমন এক সময়ে, যখন স্ক্রিন ও দ্রুতগতির ডিজিটাল বিনোদন শিশুদের অবসরকে ক্রমশ বদলে দিচ্ছে, তখন গল্পের বই এখনও যে কল্পনার শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে, অনুষ্ঠানটি যেন সেই কথাই বলল।

কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও বড়রাও যেন ফিরে পেলেন নিজেদের ছোটবেলা—যে সময়ে একটি গল্পের বই হাতে নিয়ে অজানা পৃথিবীতে হারিয়ে যাওয়া ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দ। আর শিশুদের জন্য রয়ে গেল নতুন গল্প, নতুন ছবি এবং নিজের কল্পনায় আরও অনেক পৃথিবী তৈরি করার সুযোগ।
‘কি মজা!’, ‘গল্পে ছবিতে উৎসব’ এবং ‘তাতার গল্প’-এর প্রকাশনা তাই বাংলা শিশু সাহিত্যের পরিসরে একটি আনন্দময় সংযোজন। এই বইগুলির মাধ্যমে গল্প, ছবি ও অন্তর্ভুক্তির যে বার্তা সামনে এসেছে, তা মনে করিয়ে দেয়—প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, কল্পনার জগৎ তৈরি করার জন্য একটি বইয়ের পাতার আবেদন এখনও অনন্য।
সম্ভবত সেই কারণেই বই আজও এত আপন। কারণ একটি ভালো গল্প শেষ হয়ে গেলেও তার তৈরি করা কল্পনার পৃথিবী পাঠকের মনে থেকে যায়—আর কখনও কখনও, সেই পৃথিবীর পথ ধরেই আমরা আবার নিজের শৈশবকে খুঁজে পাই।








