দুর্গাপুজো মানেই শুধু মণ্ডপ পরিক্রমা নয়, বাঙালির কাছে এটি নতুন পোশাক, গয়না, জুতো, উপহার আর উৎসবের সাজে নিজেকে নতুন করে সাজানোর সময়। পুজোর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই কলকাতার বাজারগুলিতে শুরু হয়ে যায় কেনাকাটার ব্যস্ততা।
২০২৬-এর দুর্গাপুজো সামনে রেখে শহরের বিভিন্ন বাজারেও বাড়ছে ক্রেতাদের আনাগোনা। কেউ খুঁজছেন ট্রেন্ডি ওয়েস্টার্ন পোশাক, কেউ আবার পুজোর জন্য ঐতিহ্যবাহী তাঁত, গরদ বা জামদানি। বাজেট অনুযায়ী সঠিক বাজার বেছে নিলে একই শহরে পাওয়া যায় একেবারে ভিন্ন ধরনের শপিং অভিজ্ঞতা।
কলকাতার বিশেষত্ব হল—শপিংয়ের জন্য এখানে একটি নির্দিষ্ট বাজারের উপর নির্ভর করতে হয় না। নিউ মার্কেটের ঐতিহ্য থেকে গড়িয়াহাটের বৈচিত্র্য, হাতিবাগানের ভিড় থেকে দক্ষিণাপনের হ্যান্ডলুম সংগ্রহ—প্রতিটি জায়গার নিজস্ব চরিত্র রয়েছে।
তাই পুজোর কেনাকাটার পরিকল্পনা করার আগে জেনে নেওয়া যাক কলকাতার কয়েকটি জনপ্রিয় শপিং ডেস্টিনেশন এবং কোন ধরনের কেনাকাটার জন্য সেগুলি আপনার তালিকায় রাখা যেতে পারে।
গড়িয়াহাট: পুজোর কেনাকাটায় বৈচিত্র্যের ঠিকানা

পুজোর শপিংয়ের কথা উঠলে কলকাতার অন্যতম প্রথম নাম গড়িয়াহাট। দক্ষিণ কলকাতার এই ব্যস্ত বাজারে একই সঙ্গে পাওয়া যায় শাড়ি, পাঞ্জাবি, কুর্তা, সালোয়ার-কামিজ, টি-শার্ট, জুতো, ব্যাগ, অ্যাকসেসরিজ এবং নানা ধরনের ফ্যাশন সামগ্রী।
বিশেষ করে শাড়িপ্রেমীদের কাছে গড়িয়াহাট দীর্ঘদিনের পছন্দের জায়গা। বাজেটের মধ্যে পুজোর পোশাক খুঁজছেন এমন ক্রেতাদের জন্যও এখানে রয়েছে প্রচুর বিকল্প। রাস্তার দোকান থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত শোরুম—দুই ধরনের শপিংয়ের অভিজ্ঞতাই পাওয়া যায়।
তবে পুজোর মরশুমে ভিড় দ্রুত বাড়ে। তাই আরাম করে কেনাকাটা করতে চাইলে দুপুরের ব্যস্ত সময় এড়িয়ে তুলনামূলক আগে যাওয়াই সুবিধাজনক হতে পারে। দরদাম করার সুযোগ রয়েছে এমন দোকানে কেনাকাটার ক্ষেত্রে আগে কয়েকটি দোকান ঘুরে দাম তুলনা করাও বুদ্ধিমানের কাজ।
গড়িয়াহাটের আরেকটি সুবিধা হল আশপাশের অঞ্চলেই রয়েছে বহু খাবারের দোকান ও ক্যাফে। ফলে কয়েক ঘণ্টার শপিং প্ল্যানকে সহজেই একটি পূর্ণাঙ্গ আউটিংয়ে পরিণত করা যায়।
নিউ মার্কেট ও এসপ্ল্যানেড: ঐতিহ্য, ফ্যাশন ও এক ছাদের নিচে অনেক কিছু

কলকাতার শপিং ইতিহাসে নিউ মার্কেটের জায়গা আলাদা। বহু দশক ধরে শহরের কেনাকাটার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে থাকা এই বাজার এখনও পুজোর সময়ে ক্রেতাদের আকর্ষণ করে।
পোশাক থেকে জুতো, ব্যাগ থেকে অ্যাকসেসরিজ, কসমেটিক্স থেকে উপহার—বিভিন্ন ধরনের পণ্যের জন্য নিউ মার্কেট ও সংলগ্ন এসপ্ল্যানেড এলাকা ঘুরে দেখা যায়। পরিবারের একাধিক সদস্যের জন্য একসঙ্গে কেনাকাটা করার পরিকল্পনা থাকলে এই অঞ্চলটি বিশেষভাবে কাজে আসতে পারে।
নিউ মার্কেটের পাশাপাশি এসপ্ল্যানেড ও আশপাশের শপিং জোনে রয়েছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকান ও শপিং কমপ্লেক্স। ফলে ঐতিহ্যবাহী বাজারের সঙ্গে আধুনিক রিটেল শপিং—দুই অভিজ্ঞতাই একই ট্রিপে পাওয়া সম্ভব।
পুজোর সময়ে এই অঞ্চলে ভিড় অত্যন্ত বেশি হতে পারে। গণপরিবহণ ব্যবহার করে যাওয়া এবং কেনাকাটার তালিকা আগে থেকে তৈরি করে নেওয়া সময় বাঁচাতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে অষ্টমী বা নবমীর আগে শেষ মুহূর্তের শপিং করতে গেলে ভিড়ের বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি।
হাতিবাগান ও দক্ষিণাপন: বাজেট থেকে হ্যান্ডলুম—দুই ধরনের শপিং

উত্তর কলকাতার হাতিবাগান পুজোর কেনাকাটার জন্য আরেকটি পরিচিত নাম। পোশাক, জুতো, ব্যাগ এবং দৈনন্দিন ফ্যাশন সামগ্রীর বিভিন্ন বাজেটের বিকল্প এখানে পাওয়া যায়। উত্তর কলকাতার পুজো ঘোরার সঙ্গে হাতিবাগান শপিংকে মিলিয়ে নেওয়াও অনেকের পছন্দের পরিকল্পনা।
অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পোশাক ও হ্যান্ডলুমের প্রতি আগ্রহ থাকলে দক্ষিণাপন শপিং সেন্টার রাখা যেতে পারে তালিকায়। বিভিন্ন রাজ্যের হস্তশিল্প, তাঁত এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সম্ভার এখানে শপিংকে আলাদা মাত্রা দেয়।
যাঁরা পুজোর জন্য শুধু ট্রেন্ডি পোশাক নয়, বরং দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যাবে এমন শাড়ি বা হ্যান্ডলুম সংগ্রহ করতে চান, তাঁদের জন্য এই ধরনের বাজার বিশেষ আকর্ষণীয় হতে পারে। একই সঙ্গে উপহার কেনার ক্ষেত্রেও হস্তশিল্পজাত সামগ্রী একটি ভিন্নধর্মী বিকল্প।
কলকাতায় পুজোর শপিংয়ে যাওয়ার আগে যে বিষয়গুলি মাথায় রাখবেন
পুজোর কেনাকাটার ক্ষেত্রে শুধু বাজার বেছে নেওয়াই যথেষ্ট নয়। আগে থেকেই বাজেট নির্ধারণ করলে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা অনেকটাই এড়ানো যায়। পোশাক, জুতো, অ্যাকসেসরিজ এবং উপহারের জন্য আলাদা বাজেট রাখলে হিসাব করাও সহজ হয়।
একই পণ্য একাধিক দোকানে পাওয়া গেলে প্রথম দোকানেই কেনার বদলে দাম ও মান তুলনা করে দেখা ভালো। বিশেষ করে রাস্তার বাজারে দরদামের সুযোগ থাকলেও পণ্যের গুণমান যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
অনলাইন শপিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়লেও পুজোর বাজারে অফলাইন কেনাকাটার আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। কাপড়ের মান হাতে দেখে নেওয়া, পোশাক ট্রায়াল করা এবং দোকানদারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ অনেক ক্রেতার কাছেই গুরুত্বপূর্ণ।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করা। মহালয়ার পর কলকাতার বাজারে ভিড় দ্রুত বাড়তে থাকে। তাই পুজোর কয়েক সপ্তাহ আগেই কেনাকাটার তালিকা তৈরি করে ধাপে ধাপে শপিং সেরে ফেললে সময়, টাকা এবং পরিশ্রম—তিনটিই নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ।
দুর্গাপুজোর কলকাতা শুধু মণ্ডপ আর আলোর শহর নয়, এটি কেনাকাটারও এক বিশাল উৎসব। গড়িয়াহাটের বৈচিত্র্য, নিউ মার্কেটের ঐতিহ্য, হাতিবাগানের ব্যস্ত বাজার কিংবা দক্ষিণাপনের হ্যান্ডলুম—প্রতিটি জায়গার রয়েছে নিজস্ব আকর্ষণ।
২০২৬-এর পুজোয় কোথায় যাবেন, তা নির্ভর করবে আপনার বাজেট, পছন্দ এবং কী ধরনের কেনাকাটা করতে চান তার উপর। পরিকল্পনা করে বেরোলে কলকাতার পুজোর বাজার থেকেই মিলতে পারে উৎসবের জন্য প্রয়োজনীয় পোশাক ও উপহারের সম্পূর্ণ সংগ্রহ।







