হরিশ রানা মামলা: ১৩ বছর কোমায় থাকা যুবককে নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি, প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া নিয়ে ঐতিহাসিক রায় সুপ্রিম কোর্টের

হরিশ রানা মামলা: ১৩ বছর কোমায় থাকা যুবককে নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি, ঐতিহাসিক রায় সুপ্রিম কোর্টের

একুশে পা নিউজ ডেস্ক:
ভারতে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া (Passive Euthanasia) বা নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। ১৩ বছর ধরে কোমায় থাকা ৩২ বছর বয়সি হরিশ রানাকে চিকিৎসা প্রত্যাহারের অনুমতি দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এর ফলে কার্যত ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যু’ (Death with Dignity) পাওয়ার পথ খুলে গেল তাঁর সামনে।

আদালতের নির্দেশে এটিকে দেশের প্রথম প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া সংক্রান্ত বাস্তবায়িত ঘটনা হিসেবে ধরা হচ্ছে। এই রায় দেন বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কেভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ।

রায়ে আদালত ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক রায়ের বিভিন্ন দিক আরও স্পষ্ট করে দেয়, যেখানে ভারতে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়াকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।


ফিডিং টিউবের মাধ্যমে খাবারও চিকিৎসার অংশ: আদালত

হরিশ রানা মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন ছিল—ফিডিং টিউবের মাধ্যমে দেওয়া খাবার ও পুষ্টি কি চিকিৎসার অংশ হিসেবে ধরা হবে কি না।

সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে টিউবের মাধ্যমে দেওয়া পুষ্টি ও জলও চিকিৎসারই অংশ।

ফলে যদি প্রাথমিক ও দ্বিতীয় মেডিক্যাল বোর্ড মনে করে যে এই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া রোগীর স্বার্থে নয়, তাহলে তা বন্ধ করা যেতে পারে।


জীবন ও মৃত্যু নিয়ে আবেগঘন পর্যবেক্ষণ

রায় ঘোষণার সময় বেঞ্চ জীবন ও মৃত্যুর জটিলতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে। আদালত মার্কিন ধর্মপ্রচারক হেনরি ওয়ার্ড বিচার–এর উক্তি উদ্ধৃত করে জানায়—

“ঈশ্বর মানুষকে জিজ্ঞেস করেন না সে জীবন গ্রহণ করবে কি না। জীবন গ্রহণ করতেই হয়, প্রশ্ন হল কীভাবে।”

এছাড়াও বিচারপতিরা উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত উক্তি “To be or not to be”–এর কথাও উল্লেখ করেন।


কী ঘটেছিল হরিশ রানার সঙ্গে

২০১৩ সালে একটি বহুতলের চতুর্থ তলা থেকে পড়ে গুরুতরভাবে আহত হন হরিশ রানা। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর।

দুর্ঘটনার পর থেকেই তিনি পারসিস্টেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট (Persistent Vegetative State)–এ চলে যান এবং সম্পূর্ণ কোয়াড্রিপ্লেজিয়া (Quadriplegia)–তে আক্রান্ত হন।

মেডিক্যাল রিপোর্ট অনুযায়ী, তাঁর ঘুম ও জেগে ওঠার চক্র থাকলেও কোনও অর্থপূর্ণ নড়াচড়া বা প্রতিক্রিয়া নেই।

দুর্ঘটনার পর থেকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বসানো ফিডিং টিউবের সাহায্যে তাঁকে খাবার দেওয়া হচ্ছিল।


আদালতের দ্বারস্থ হন বাবা-মা

বছরের পর বছর কোনও উন্নতি না হওয়ায় হরিশ রানার বাবা-মা আদালতের দ্বারস্থ হন।

তাঁদের দাবি ছিল, তাঁদের ছেলে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে এবং এই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার আর কোনও বাস্তব উপকার নেই।

সব দিক বিবেচনা করে সুপ্রিম কোর্ট চিকিৎসা প্রত্যাহারের অনুমতি দেয়।


গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ

রায়ে আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, এ ধরনের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন মৃত্যু নয়, বরং চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া রোগীর সর্বোত্তম স্বার্থে কি না।

আদালতের মতে, যতক্ষণ চিকিৎসা রোগীর উপকারে আসে ততক্ষণ তা চালিয়ে যাওয়া চিকিৎসকদের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চিকিৎসা কেবলমাত্র আরোগ্যের কোনও সম্ভাবনা ছাড়াই জৈবিক জীবন দীর্ঘায়িত করে, তখন সেই চিকিৎসা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে ভারতে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া সংক্রান্ত মামলাগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ দিশা দেখাবে।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
Email
Print
আরও পড়ুন
error: Content is protected !!