নিজস্ব প্রতিবেদন | কলকাতা
আজ ১লা মে। ইতিহাসের পাতায় আজকের দিনটি শুধু শ্রমিক দিবস হিসেবেই নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও সামাজিক পুনর্জাগরণের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত। ১৮৯৭ সালের আজকের এই দিনেই যুগনায়ক স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের আদর্শকে মূর্ত রূপ দিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘রামকৃষ্ণ মিশন’।

স্থাপনা ও প্রেক্ষাপট
১৮৯৬ সালে বিদেশ বিভুঁইয়ে বেদান্তের বিজয়পতাকা উড়িয়ে ভারতমাতার বীর সন্তান বিবেকানন্দ যখন দেশে ফিরলেন, তাঁর মনে তখন একটাই চিন্তা— আর্তের সেবা ও আর্তের ত্রাণ। শ্রীরামকৃষ্ণের ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’র মন্ত্রকে জনকল্যাণে ছড়িয়ে দিতে তিনি কলকাতার বলরাম বসুর বাসভবনে এক সভার আয়োজন করেন। সেখানেই জন্ম নেয় ‘রামকৃষ্ণ মিশন’।

‘রামকৃষ্ণ মঠ’ ও ‘মিশন’: একই মুদ্রার দুই পিঠ
অনেকেই মঠ ও মিশনের পার্থক্য নিয়ে দ্বিধায় থাকেন। মূলত ১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ হলো সন্ন্যাসী সঙ্ঘ, যা আধ্যাত্মিক সাধনা ও তাত্ত্বিক চর্চায় নিয়োজিত। অন্যদিকে, রামকৃষ্ণ মিশন হলো একটি জনকল্যাণমূলক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যা ১৯০৯ সালে আইনি স্বীকৃতি পায়। দুটি সংগঠনেরই প্রধান কার্যালয় হাওড়া জেলার বেলুড় মঠে অবস্থিত।

আদর্শ ও মূল লক্ষ্য
রামকৃষ্ণ মিশনের মূল ভিত্তি হলো ‘কর্মযোগ’। মিশনের প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হলো:
- মানবে সেবা: জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আর্ত মানুষের সেবা করা।
- শিক্ষা বিস্তার: বুনিয়াদি থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রসারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা।
- ত্রাণকার্য: খরা, বন্যা বা মহামারীর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়া।
- ধর্মীয় সম্প্রীতি: শ্রীরামকৃষ্ণের ‘যত মত তত পথ’ আদর্শে সব ধর্মের মধ্যে সৌহার্দ্য স্থাপন।
বিংশ শতাব্দী থেকে বর্তমান: সেবার মহাযজ্ঞ
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যে চারাগাছটি বিবেকানন্দ রোপণ করেছিলেন, আজ তা এক বিশাল মহীরুহ। ভারতের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে এর শাখা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘বেদান্ত সোসাইটি’ থেকে শুরু করে আদিবাসী কল্যাণ প্রকল্প— সর্বত্রই আজ মিশনের সক্রিয় উপস্থিতি। স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদান থেকে শুরু করে গ্রামীণ উন্নয়নে রামকৃষ্ণ মিশনের অবদান অনস্বীকার্য।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর? জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” আজ ১২৯ বছর পূর্ণ করে রামকৃষ্ণ মিশন সেই আদর্শকেই বহন করে চলেছে। আজকের এই শুভ দিনে মিশনের প্রতিটি সন্ন্যাসী ও গৃহস্থ ভক্তের ত্যাগ ও সেবাকে শ্রদ্ধা জানায় সারা বিশ্ব।






