চোরবাগান দুর্গাপুজো বিপর্যয়: সরু প্রবেশপথ, কম আলো ও বন্ধ এমার্জেন্সি এক্সিট নিয়ে প্রশ্ন, তদন্তে সিট

চোরবাগান দুর্গাপুজো বিপর্যয়: সরু প্রবেশপথ, কম আলো ও বন্ধ এমার্জেন্সি এক্সিট নিয়ে প্রশ্ন, তদন্তে সিট

কলকাতা, ২৩ অক্টোবর ২০২৬: উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নেমেছে বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT)। মণ্ডপ পরিদর্শনের পর প্রবেশ ও বেরোনোর রাস্তা অত্যন্ত সরু এবং আলোর ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত বলে পর্যবেক্ষণ করেছেন সিটের প্রধান, কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী। দুর্ঘটনার সময় জরুরি নির্গমনপথ বন্ধ ছিল বলেও পুলিশ সূত্রে তাঁকে জানানো হয়েছে। ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৫ জন দর্শনার্থী।

চোরবাগান মণ্ডপ পরিদর্শনে সিট প্রধান, ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ

গত ২২ অক্টোবর সন্ধ্যায় চোরবাগান দুর্গাপুজোর দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীর নেতৃত্বাধীন তদন্তকারী দল। দুর্ঘটনার সময় মণ্ডপে যে ধরনের আলোর ব্যবস্থা ছিল, সেই আলোতেই মণ্ডপের ভিতর ও আশপাশের এলাকা খতিয়ে দেখা হয়।

পরিদর্শনের পর সিট প্রধান জানান, মণ্ডপে প্রবেশ ও বেরোনোর পথ অত্যন্ত সংকীর্ণ ছিল। আলোর ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত ছিল না। তাঁর পর্যবেক্ষণে, বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর সমাগমের ক্ষেত্রে এই ধরনের পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। মণ্ডপের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।

তবে তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ বা কারও দায় সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয় বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে।

১৯ জনের মৃত্যু, আহত ২৫: কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা?

গত ১৭ অক্টোবর, মহাসপ্তমীর দিন, চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপের সামনে ভিড়ের চাপে ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে। এই দুর্ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয় এবং ২৫ জন আহত হন।

প্রাথমিকভাবে অতিরিক্ত ভিড়, প্রবেশ ও প্রস্থানের সংকীর্ণ পথ, জরুরি নির্গমনপথের ব্যবহার এবং মাইকে ঘোষণাকে ঘিরে তৈরি হওয়া আতঙ্কের মতো একাধিক বিষয় তদন্তের আওতায় এসেছে। তবে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ভিড়ের চাপ বাড়ল এবং কীভাবে তা প্রাণঘাতী বিপর্যয়ে পরিণত হল, তা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।

বিভ্রান্তিকর ঘোষণার অভিযোগও তদন্তের আওতায়

দুর্ঘটনার আগে মাইকে করা একটি ঘোষণাকে ঘিরেও তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযোগ, বৃষ্টি ও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে মণ্ডপ ভেঙে পড়তে পারে—এমন বার্তা দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছিল। ওই ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত এক ক্লাব সদস্যকে পুলিশ আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, ওই ঘোষণার ফলে ভিড়ের গতিবিধিতে কোনও পরিবর্তন ঘটেছিল কি না এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা কতটা ছিল। অভিযোগের সত্যতা ও দুর্ঘটনার সঙ্গে এর যোগসূত্র তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে ছয় সদস্যের তদন্তকারী দল

চোরবাগান দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং দায় নির্ধারণের উদ্দেশ্যে রাজ্য সরকার কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ ও পরামর্শের পরিপ্রেক্ষিতে ছয় সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছে। এই দলের নেতৃত্বে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী।

দলে রয়েছেন বিপর্যয় মোকাবিলা ও নাগরিক সুরক্ষা দপ্তরের প্রতিনিধি, রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের শীর্ষ আধিকারিক, রাজ্য পুলিশের প্রতিনিধিসহ স্বরাষ্ট্র দপ্তর এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর প্রতিনিধি।

তদন্তে দুর্ঘটনার আগে ও পরে ভিড়ের গতিবিধি, মণ্ডপের নকশা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমনপথ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে। সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনে তোলা ভিডিও, ফরেনসিক রিপোর্ট ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাজ্য সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, সিটকে তিন মাসের মধ্যে তদন্তের রিপোর্ট ও সুপারিশ জমা দিতে হবে।

প্রতিমা নিরঞ্জন হলেও অক্ষত রাখতে হবে মণ্ডপ

তদন্তের স্বার্থে চোরবাগান পুজোর মণ্ডপের বর্তমান কাঠামো সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন সিট প্রধান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে প্রতিমা নিরঞ্জন করা যেতে পারে, তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মণ্ডপের কাঠামো অপরিবর্তিত রাখতে হবে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে ফরেনসিক দলের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। মণ্ডপের বিন্যাস, প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ এবং আশপাশের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা।

বড় পুজোয় ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

চোরবাগানের এই মর্মান্তিক ঘটনা কলকাতার বড় দুর্গাপুজোগুলিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, জরুরি নির্গমনপথ, পর্যাপ্ত আলো এবং বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষত উত্তর কলকাতার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সরু রাস্তা ও সীমিত জায়গার মধ্যে বিপুল দর্শনার্থীর সমাগম হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সিটের তদন্তে কারও গাফিলতি বা সমন্বয়ের অভাবের প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপের সুপারিশ করা হতে পারে। তবে চূড়ান্ত দায় নির্ধারিত হবে তদন্তের রিপোর্ট ও প্রমাণের ভিত্তিতেই।

চোরবাগানের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো মানুষদের পরিবারের কাছে এখন ন্যায়বিচারই প্রধান প্রত্যাশা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে কোনও উৎসবের আনন্দ এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে না পৌঁছয়, তার জন্য কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
Email
Print
আরও পড়ুন
error: Content is protected !!