কলকাতা, ২ অক্টোবর ২০২৬: দুর্গাপুজোর আবহে এবার সামাজিক বার্তা ও শিল্পভাবনার এক অনন্য মেলবন্ধন তুলে ধরছে মধ্য কলকাতার Young Boys Club। তারা ৫৭তম বর্ষের দুর্গাপুজোয় বেছে নিয়েছে ‘রাম রাজ্য’ থিম, যার কেন্দ্রে রয়েছে শান্তি, ন্যায়, মর্যাদা, সম্প্রীতি ও আদর্শ সমাজের ভাবনা।
তারা চাঁদ দত্ত স্ট্রিট, মধ্য কলকাতায় এমন একটি পুজো আয়োজন করছে, যেখানে প্যান্ডেলের নকশা ও প্রতিমার পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে পরিবেশবান্ধব উপকরণ এবং সামাজিক মূল্যবোধ। আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘রাম রাজ্য’ এখানে কোনও একটি মাত্র ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ন্যায়, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থানের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
এই ভাবনাকে সামনে রেখে প্যান্ডেলের সাজসজ্জায় ব্যবহার করা হচ্ছে শুকনো পাতা, ফল, ফুল, বীজ ও প্রাকৃতিক তন্তুর মতো উপকরণ। শিল্পী দেবশঙ্কর মাহেশ-এর পরিকল্পনায় তৈরি হচ্ছে এই পরিবেশসচেতন শিল্পকর্ম। পূর্ব মেদিনীপুরের কারিগরদের দক্ষ হাতে প্রাকৃতিক উপাদানগুলি রূপ নিচ্ছে একটি বৃহৎ ও নিমগ্ন শিল্পস্থাপনায়।
প্রাকৃতিক উপকরণে পরিবেশবান্ধব প্যান্ডেল
Young Boys Club-এর এবারের প্যান্ডেলের অন্যতম আকর্ষণ তার পরিবেশবান্ধব নকশা। দৈনন্দিন জীবনে দেখা যায় এমন প্রাকৃতিক উপাদানকে শিল্পের ভাষায় নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। শুকনো পাতা, ফুল, ফল, বীজ এবং ফাইবারের মতো উপকরণ দিয়ে তৈরি হচ্ছে প্যান্ডেলের নানা অলংকার ও আলংকারিক অংশ।
এই নকশার মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং টেকসই ভাবনার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। সূক্ষ্ম কারুকাজ ও সমকালীন আলোকসজ্জার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে মিলিয়ে দর্শকদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে একটি ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা।

‘রাম রাজ্য’-তে ন্যায়, মর্যাদা ও সম্প্রীতির বার্তা
এবারের থিমের মাধ্যমে আয়োজকেরা এমন একটি সমাজের কল্পনা তুলে ধরতে চাইছেন, যেখানে অন্যায়ের বদলে ন্যায়, অপমানের বদলে মর্যাদা এবং বিভেদের বদলে সম্প্রীতি গুরুত্ব পায়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কও এই ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
Young Boys Club-এর প্রধান আয়োজক রাকেশ সিংহ জানিয়েছেন, দুর্গাপুজো তাঁদের কাছে ভক্তি, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক বার্তাকে একসঙ্গে তুলে ধরার সুযোগ। যুব সভাপতি বিক্রান্ত সিংহ-এর বক্তব্যেও ন্যায়, দায়িত্ব, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার মতো মূল্যবোধের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই ভাবনাকে আরও দৃশ্যমান করে তুলতে দেবী দুর্গার প্রতিমা নির্মাণ করেছেন মেদিনীপুরের বিশিষ্ট ভাস্কর কুশাধ্বজ বেরা। ফলে প্যান্ডেলের স্থাপত্য, প্রতিমা এবং সামাজিক বক্তব্য—তিনটি স্তর মিলেই তৈরি করছে এবারের উপস্থাপনা।

মহাপঞ্চমী থেকে দর্শনার্থীদের জন্য খুলবে প্যান্ডেল
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মহাপঞ্চমী থেকে দর্শনার্থীদের জন্য প্যান্ডেল খুলে দেওয়া হবে। পুজোর দিনগুলিতে বৃহৎ পরিসরে প্রসাদ বিতরণেরও পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত হয়।
Young Boys Club-এর সহ-আয়োজক বিনোদ সিংহ জানিয়েছেন, প্রতি বছর তাঁদের লক্ষ্য থাকে দর্শকদের জন্য স্মরণীয় অভিজ্ঞতা তৈরি করা। এবারে প্রাকৃতিক উপকরণ, ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প এবং আধুনিক আলোকসজ্জাকে একসঙ্গে ব্যবহার করে সেই প্রচেষ্টাই এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তারা দত্ত চন্দ্র স্ট্রিটের এই পুজোর মাধ্যমে কলকাতার দুর্গোৎসবের শিল্প, সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং সামাজিক মূল্যবোধকে একই পরিসরে তুলে ধরতে চাইছে। ফলে ৫৭তম বর্ষের এই আয়োজন শুধু প্যান্ডেল দর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক বার্তাও বহন করবে।

প্রাকৃতিক উপকরণের সৃজনশীল ব্যবহার, মেদিনীপুরের কারিগরদের শিল্পদক্ষতা এবং ‘রাম রাজ্য’-এর সামাজিক বার্তা—এই তিনের সমন্বয়ে এবারের দুর্গাপুজোয় আলাদা মাত্রা যোগ করতে চলেছে Young Boys Club। শান্তি, মর্যাদা, ন্যায় ও সম্প্রীতির বার্তা সামনে রেখে তাদের ৫৭তম বর্ষের আয়োজন কলকাতার পুজো-সংস্কৃতিতে একটি ভাবনামূলক উপস্থাপনা হিসেবে জায়গা করে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।








