হাই কোর্টের নির্দেশের পর অননুমোদিত প্রাণী ও বন্যপ্রাণী বেচাকেনার বিরুদ্ধে নজরদারি; বৈধ ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়েও উঠছে প্রশ্ন
রবিবারের সকাল। গ্যালিফ স্ট্রিটে নেই চেনা কোলাহল, নেই আগের মতো পসরা সাজানোর ব্যস্ততা। কলকাতার অন্যতম পরিচিত পুরনো পোষ্য ও শখের বাজারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশের পর বেআইনি ও অননুমোদিতভাবে প্রাণী, পাখি, মাছ, গাছপালা এবং অন্যান্য পোষ্য-সংক্রান্ত সামগ্রীর বেচাকেনা বন্ধ করতে সক্রিয় হয়েছে কলকাতা পুলিশ, কাস্টমস ও বন দফতরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গ্যালিফ স্ট্রিটের এই রবিবারের বাজার বহু দশক ধরে কলকাতার পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠান। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজারটির বয়স প্রায় এক শতাব্দীর কাছাকাছি। হাতিবাগান এলাকা থেকে স্থানান্তরের পর গ্যালিফ স্ট্রিটে ধীরে ধীরে এই বাজারের বিস্তার ঘটে।
তবে আদালতের সাম্প্রতিক নির্দেশের মূল লক্ষ্য কোনও ঐতিহ্যবাহী বাজারকে অকারণে বন্ধ করা নয়। লক্ষ্য হল আইনবহির্ভূত প্রাণী ও বন্যপ্রাণী বেচাকেনা, সংরক্ষিত প্রজাতির পাচার এবং প্রয়োজনীয় অনুমতি বা নথি ছাড়া ব্যবসা বন্ধ করা।
১৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ কলকাতা পুলিশকে অননুমোদিত ব্যবসা বন্ধ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়। কাস্টমস এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রধান মুখ্য বনপালককেও নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পুজোর আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ কী?
গ্যালিফ স্ট্রিটের সঙ্গে বহু ছোট ব্যবসায়ী বছরের পর বছর ধরে যুক্ত। তাঁদের মধ্যে অনেকেই পোষ্য, মাছ, গাছপালা এবং পোষ্য-সংক্রান্ত সামগ্রী নিয়ে ব্যবসা করেন।
আদালতের নির্দেশ মেনে বেআইনি ব্যবসা বন্ধ করা হলেও, যাঁরা বৈধভাবে ব্যবসা করতে চান তাঁদের জন্য ভবিষ্যতে কী ব্যবস্থা থাকবে—এই প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে দুর্গাপুজোর মরসুম সামনে। এই সময় বহু ব্যবসায়ীর বিক্রি বাড়ে। ফলে এমন একটি সময়ে বাজারের ব্যবসা কার্যত থমকে যাওয়ায় তাঁদের উপার্জনের উপর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাজারের ব্যবসায়ী সংগঠনের বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে ৭০০-রও বেশি সদস্য রয়েছেন এবং তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। একইসঙ্গে বহু ব্যবসায়ীর এখনও KMC ট্রেড লাইসেন্স নেই বলেও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
শুধু বিক্রেতা নন, সমস্যায় ক্রেতারাও
গ্যালিফ স্ট্রিটে শুধু জীবন্ত পোষ্য কেনাবেচাই হতো না। বহু মানুষ সেখানে পোষ্যের খাবার, অ্যাকোয়ারিয়ামের সামগ্রী, মাছের খাদ্য, পাখির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং অন্যান্য পোষ্য-সংক্রান্ত সামগ্রী কিনতে যেতেন।

তাই বাজারে কড়া নজরদারি ও বিধিনিষেধের প্রভাব শুধু ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নিয়মিত ক্রেতাদের কাছেও এখন প্রশ্ন—তাঁরা তাঁদের পোষ্যের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কোথা থেকে সংগ্রহ করবেন?
অবশ্যই, এর অর্থ এই নয় যে বেআইনি বন্যপ্রাণী বা সংরক্ষিত প্রজাতির বেচাকেনাকে ছাড় দেওয়া উচিত। বরং বৈধ পোষ্য-সংক্রান্ত ব্যবসা এবং বেআইনি বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করাই এখন বড় প্রয়োজন।
‘বেআইনি ব্যবসা বন্ধ হোক, কিন্তু বৈধ ব্যবসার পথও খুলুক’
হাই কোর্টের নির্দেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অনুমোদনহীন ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। এমনকি KMC-র কোনও অনুমতির আড়ালেও যদি বিপন্ন বা সংরক্ষিত প্রজাতির পাখি কেনাবেচা বা পাচার হয়, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
২০ সেপ্টেম্বর বাজারে পুলিশ ও কাস্টমসের নজরদারির সময় মূলত সচেতনতা, লাইসেন্স যাচাই এবং আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার উপর জোর দেওয়া হয়। ওই দিনের পরিদর্শনে পুলিশ বা কাস্টমসের পক্ষ থেকে কোনও সরকারি seizure হয়নি বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন প্রয়োজন হতে পারে একটি সুস্পষ্ট বৈধ কাঠামো—কোন প্রাণী বা পাখি রাখা বা বিক্রি করা যাবে, কোনটির ক্ষেত্রে কী লাইসেন্স প্রয়োজন, কী নথি থাকতে হবে এবং কোথায় বৈধভাবে ব্যবসা করা যাবে—এসব বিষয়ে ব্যবসায়ীদের পরিষ্কার নির্দেশিকা দেওয়া।
কারণ, একটি পুরনো বাজারের বেআইনি অংশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সেই বাজারের সঙ্গে যুক্ত বৈধ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা রক্ষা—দুটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করা সম্ভব কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সামনে ৩০ সেপ্টেম্বর ও ৬ অক্টোবর
এই বিষয়ে রাজ্য সরকারকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পদক্ষেপের স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। মামলাটি পরবর্তী শুনানির জন্য ৬ অক্টোবর নির্ধারিত রয়েছে।

ফলে গ্যালিফ স্ট্রিটের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে আদালতের পরবর্তী শুনানি এবং প্রশাসনের পদক্ষেপের উপর।
আইনবিরুদ্ধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য বন্ধ হওয়া জরুরি। কিন্তু সেই সঙ্গে বৈধ ব্যবসায়ী, পোষ্যপ্রেমী এবং বহু বছরের পুরনো একটি বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজা সম্ভব কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।







