ফলহারিণী কালীপূজা ২০২৬: অশুভ কর্মফল থেকে মুক্তির আরাধনা, জ্যৈষ্ঠের অমাবস্যায় রাজ্যজুড়ে মাতৃবন্দনা

ফলহারিণী কালীপূজা ২০২৬: অশুভ কর্মফল থেকে মুক্তির আরাধনা, জ্যৈষ্ঠের অমাবস্যায় রাজ্যজুড়ে মাতৃবন্দনা

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথি। সনাতন ধর্মাবলম্বী ও বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম এক পুণ্যলগ্নে রাজ্যজুড়ে উদযাপিত হচ্ছে ‘ফলহারিণী কালীপূজা’। শাস্ত্রীয় মতে, দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়ার নানা রূপের মধ্যে এই বিশেষ তিথির আরাধনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মনে করা হয়, দেবী কালী এই রূপে ভক্তের জীবনের সমস্ত অশুভ কর্মফল ও মানসিক কলুষতা হরণ করেন; সেই কারণেই তিনি ‘ফলহারিণী’।

তিথি ও পূজার নির্ঘণ্ট

বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফলহারিণী অমাবস্যা তিথি শুরু হয়েছে আজ ১৬ মে, শনিবার ভোর ৫টা ১৩ মিনিটে এবং এই তিথি স্থায়ী হবে মধ্যরাত ১টা ৩১ মিনিট পর্যন্ত। অমাবস্যার নিশিপালনের রীতি মেনে দক্ষিণেশ্বর, তারাপীঠ, আদ্যাপীঠসহ রাজ্যের বিভিন্ন শক্তিপীঠ ও গৃহস্থ বাড়িতে গভীর রাতে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়েছে।

কেন এই রূপের নাম ‘ফলহারিণী’?

‘ফল’ অর্থাৎ আমাদের কর্মের ফল এবং ‘হারিণী’ শব্দের অর্থ যিনি হরণ করেন। হিন্দু দর্শনে বিশ্বাস করা হয়, মানুষ যে কাজই করুক না কেন, তা মনে এক গভীর সংস্কার বা কর্মফল তৈরি করে। দেবী ফলহারিণী ভক্তের সেই সমস্ত কর্মের অশুভ প্রভাব এবং মায়াজাল ছিন্ন করে পরম মুক্তি ও সুখ-সমৃদ্ধি প্রদান করেন।

এই তিথিতে দেবীর চরণে বিভিন্ন ঋতুফল উৎসর্গ করার বিশেষ রীতি রয়েছে। আম, জাম, লিচু, কলা, কাঁঠালসহ হরেক রকমের মরশুমি ফল দিয়ে দেবীর নৈবেদ্য সাজানো হয়। অনেক মন্দিরে দেবীকে ফলের তৈরি মালা পরানোর রেওয়াজও রয়েছে। তারাপীঠ ও অন্যান্য মাতৃপীঠে এই দিন মায়ের বিগ্রহ ফুলের পরিবর্তে সুদৃশ্য ফল দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়।

রামকৃষ্ণ ও সারদা দেবীর ‘ষোড়শী পূজা’র স্মৃতি

ফলহারিণী কালীপূজার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। এই পুণ্য তিথিতেই শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব দক্ষিণেশ্বরের নহবতে তাঁর সহধর্মিণী মা সারদা দেবীকে ‘ষোড়শী’ (জগন্মাতা) রূপে পূজা করেছিলেন। আধ্যাত্মিক সাধনার চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর দীর্ঘ সাধনার সমস্ত লব্ধ ফল মা সারদা দেবীর চরণে সমর্পণ করেন।

এই ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব ঘটনার স্মরণে আজও বেলুড় মঠসহ বিশ্বজুড়ে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সমস্ত শাখাকেন্দ্রে অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে ফলহারিণী কালীপূজা ও সারদা দেবীর আরাধনা করা হয়। আজ রাত সাড়ে সাতটা থেকে বিভিন্ন মিশনে বিশেষ পূজার পাশাপাশি কালীকীর্তন ও ভজনের আয়োজন করা হয়েছে।

মনস্কামনা পূরণের বিশেষ ব্রত

লৌকিক বিশ্বাস ও জ্যোতিষশাস্ত্রে এই দিনের একটি বিশেষ নিয়মের উল্লেখ পাওয়া যায়। ভক্তরা নিজেদের ব্যক্তিগত মনস্কামনা পূরণের জন্য দেবীর চরণে একটি নির্দিষ্ট মরশুমি ফল উৎসর্গ করেন এবং পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে প্রার্থনা জানান। ব্রত পালনের নিয়ম অনুযায়ী, আগামী এক বছর ব্রতী আর সেই নির্দিষ্ট ফলটি গ্রহণ করেন না। এক বছরের মধ্যে মনস্কামনা পূরণ হলে প্রসাদী ফলটি গঙ্গায় বা পবিত্র জলাশয়ে ভাসিয়ে দিয়ে পুনরায় মায়ের পুজো দিয়ে তবেই সেই ফল খাওয়ার নিয়ম রয়েছে।

আজকের এই পবিত্র তিথিতে আলোয় আলোকময় হয়ে উঠেছে প্রতিটি মন্দির। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং অন্তরের অন্ধকার দূর করে আলোর দিশা আনতেই দিকে দিকে চলছে মায়ের আবাহন।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
Email
Print
আরও পড়ুন
error: Content is protected !!