হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রাচীন ও তাৎপর্যপূর্ণ উৎসব মকর সংক্রান্তি। ঋতুচক্রের পরিবর্তন, সূর্যের গতি, কৃষিজীবনের আনন্দ—সব মিলিয়ে এই উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম। ২০২৬ সালে মকর সংক্রান্তি ঠিক কবে, কোন সময়ে পূজা ও দান করা সবচেয়ে শুভ, কেন এই দিনটিকে এত পবিত্র মনে করা হয়—এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তরই থাকছে এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে।
২০২৬ সালে মকর সংক্রান্তির তারিখ ও বার
- তারিখ: ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬
- বার: বুধবার
প্রতি বছর সাধারণত ১৪ জানুয়ারিতেই মকর সংক্রান্তি পালিত হয়। কারণ এই উৎসব চন্দ্র ক্যালেন্ডার নয়, সূর্য ক্যালেন্ডার অনুসারে নির্ধারিত।
মকর সংক্রান্তি ২০২৬: পূজা মুহূর্ত ও শুভ সময় (নয়াদিল্লি, ভারত অনুযায়ী)
- সংক্রান্তি মুহূর্ত: ১৪:৪৯:৪২
- পুণ্য কাল: ১৪:৪৯:৪২ থেকে ১৭:৪৫:১০
- স্থিতিকাল: ২ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট
- মহাপুণ্য কাল: ১৪:৪৯:৪২ থেকে ১৫:১৩:৪২
- স্থিতিকাল: ২৪ মিনিট
এই সময়েই স্নান, দান, জপ, পূজা ও শুভকর্ম করা বিশেষ ফলদায়ক বলে শাস্ত্রসম্মত বিশ্বাস।
মকর সংক্রান্তি কী ও কেন এই দিনটি বিশেষ?
‘সংক্রান্তি’ শব্দের অর্থ হলো গমন বা পরিবর্তন। এই দিনে সূর্য ধনু রাশি ত্যাগ করে মকর রাশিতে প্রবেশ করে। এর সঙ্গে শুরু হয় উত্তরায়ণ—যে সময়ে সূর্যের অবস্থানের কারণে দিন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে ও রাত ছোট হয়।
এই পরিবর্তনকে প্রাচীনকাল থেকেই জীবনচক্রের এক নতুন অধ্যায় হিসেবে ধরা হয়। তাই মকর সংক্রান্তি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি প্রকৃতি ও মহাজগতের পরিবর্তনের প্রতীক।
🕉️ ধর্মীয় গুরুত্ব ও পৌরাণিক বিশ্বাস
- পুরাণ মতে, এই দিনে সূর্যদেব তাঁর পুত্র শনি দেবের গৃহে আগমন করেন। এটি পিতা–পুত্রের সুসম্পর্ক ও ক্ষমার প্রতীক।
- আরও একটি বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিন ভগবান বিষ্ণু অসুরদের পরাজিত করেন এবং পৃথিবীতে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন।
- মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাস্নান, তিল দান, অন্নদান, বস্ত্রদান করলে পাপক্ষয় হয় ও পুণ্যলাভ হয় বলে মনে করা হয়।

কৃষি ও ফসল কাটার উৎসব
মকর সংক্রান্তি মূলত ফসল কাটার উৎসব। নতুন ফসল ঘরে ওঠার আনন্দে ভারতজুড়ে কৃষিজীবী মানুষ এই দিনটি উৎসবের সঙ্গে পালন করেন। কৃষক, কৃষিশ্রমিক ও গৃহপালিত পশু—সবার পরিশ্রমের স্বীকৃতিই এই উৎসবের মূল ভাবনা।
দক্ষিণ ভারতে মকর সংক্রান্তির পরের দিন মাট্টু পোঙ্গল পালিত হয়, যেখানে কৃষিকাজে ব্যবহৃত গবাদি পশুদের সম্মান জানানো হয়। এতে মানুষ ও প্রকৃতির পারস্পরিক সহাবস্থানের বার্তা স্পষ্ট হয়।

আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে মকর সংক্রান্তি
এই সময়কে সাধু-সন্ন্যাসী ও যোগীরা নতুন আধ্যাত্মিক যাত্রার জন্য অত্যন্ত শুভ বলে মনে করেন। সাধারণ মানুষও এই দিনে—
- পুরনো দুঃখ ও তিক্ততা ভুলে যাওয়ার সংকল্প নেন
- নতুন কাজ শুরু করেন
- ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়াস নেন
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মকর সংক্রান্তির ভিন্ন রূপ
ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই এই উৎসব ভিন্ন নামে ও ভিন্ন রীতিতে পালিত হয়—
- বাংলা: পৌষ সংক্রান্তি—পিঠে, পুলি, খেজুর গুড়
- তামিলনাড়ু: পোঙ্গল—চার দিনব্যাপী ফসল উৎসব
- গুজরাট: উত্তরায়ণ—ঘুড়ি উৎসব ও উন্ধিয়ু
- পাঞ্জাব: লোহরি—আগুন জ্বালিয়ে উৎসব
- অসম: ভোগালি বা মাঘ বিহু—পিঠে ও লোকজ খেলাধুলা
- কেরালা: অনাম—নৌকা বাইচ ও সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রা
নাম আলাদা হলেও ভাবনা এক—কৃতজ্ঞতা, আনন্দ ও নতুন সূচনা।

মকর সংক্রান্তির রীতি ও লোকাচার
- তিল ও গুড় খাওয়া: শীতকালে শরীর গরম রাখে এবং সম্পর্কের মিষ্টতার প্রতীক
- ঘুড়ি ওড়ানো: সূর্যালোকে শরীর সুস্থ রাখা ও আনন্দ উদযাপন
- দান ও স্নান: আত্মশুদ্ধি ও পুণ্য অর্জনের বিশ্বাস
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে মিষ্টি খেলে মানুষের কথাবার্তা ও মনোভাবেও মিষ্টতা আসে।

তীর্থ, কুম্ভ মেলা ও মোক্ষ বিশ্বাস
মকর সংক্রান্তির দিন থেকেই উত্তর ভারতে কুম্ভ মেলা শুরু হয় এবং দক্ষিণে শবরীমালা তীর্থযাত্রা শেষের পথে যায়। বহু মানুষ এই দিনে পবিত্র নদীতে স্নান করে আত্মশুদ্ধির কামনায়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মকর সংক্রান্তিতে মৃত্যু হলে মোক্ষলাভ হয়।

মকর সংক্রান্তি ২০২৬ শুধুমাত্র একটি উৎসব নয়—এটি সূর্য, প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের জীবনের মধ্যে এক গভীর যোগসূত্রের প্রতীক।
১৪ জানুয়ারি, বুধবার—এই দিনটি হোক আপনার জীবনে নতুন আশা, শান্তি ও শুভ পরিবর্তনের সূচনা।
👉 এমনই আরও ধর্মীয় উৎসব, তিথি ও বিশেষ দিনের বিস্তারিত খবর পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের বাংলা নিউজ পোর্টালে।






