১৯৫০-এর দশকে ভারতীয় বিজ্ঞান জগতে একটি অদেখা অধ্যায় ছিল — কলকাতার বিজ্ঞানী সুধাংশু কুমার বানার্জি নিজের হাতে কৃত্রিম বৃষ্টি তৈরির পরীক্ষা চালান।
এটি কেবলমাত্র একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছিল না, বরং দেশীয় উদ্ভাবনের ইতিহাসে এটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা। বানার্জি দিল্লির পরবর্তী ক্লাউড-সিডিং প্রচেষ্টার আগেই, সীমিত প্রযুক্তি ও বাজেটের মধ্যে, সফলভাবে বৃষ্টিপাত সৃষ্টি করেছিলেন। এই নিবন্ধে আমরা দেখব কীভাবে তিনি এই পরীক্ষা চালান, তার পদ্ধতি এবং তার গুরুত্ব আজকের দিনে।
১. বানার্জির অগ্রগামী কৃত্রিম বৃষ্টি পরীক্ষা
১৯৫২ সালে বানার্জি কলকাতার জাদবপুর কলেজের সংলগ্ন গবেষণাগারে বৃষ্টিপাত সৃষ্টি করতে ব্যস্ত ছিলেন। তার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সৃজনশীল:
- গ্লাস ক্লাউড চেম্বার: বানার্জি নিজেই একটি ছোট ক্লাউড চেম্বার তৈরি করেছিলেন, যেখানে তিনি মেঘের ভেতরের ক্রিয়াকলাপ পর্যবেক্ষণ করতেন।
- হাইড্রোজেন বেলুন: মেঘের দিকে সিলভার আইয়োডাইড এবং ড্রাই আইস ছড়ানোর জন্য হাইড্রোজেন ভর্তি বেলুন ব্যবহার করা হয়েছিল।
- বাজেট ও প্রযুক্তি সীমিত: বিমানের পরিবর্তে বেলুন এবং স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে তিনি সফল বৃষ্টি তৈরি করেছিলেন।
ফলাফল চমকপ্রদ: প্রতি পরীক্ষায় বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেয়েছিল, এমনকি আশেপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতার ঘটনা ঘটেছিল। বানার্জির এই প্রয়াস প্রমাণ করেছিল যে কম খরচে এবং সীমিত প্রযুক্তির মধ্যে কৃত্রিম বৃষ্টি সম্ভব।
২. দিল্লি এবং আধুনিক ক্লাউড-সিডিং প্রেক্ষাপট

আজকের দিনে যখন দিল্লিতে ক্লাউড-সিডিং বা কৃত্রিম বৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তখন বানার্জির কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে এই ধারণা নতুন নয়।
- ভারতের প্রথম উল্লেখযোগ্য ক্লাউড-সিডিং পরীক্ষাগুলো ১৯৫৭ সালে দিল্লিতে শুরু হয়েছিল।
- বানার্জি এই কাজ করেছিলেন ১৯৫২ সালে, যা প্রায় পাঁচ বছর আগে।
- যদিও আধুনিক প্রযুক্তিতে বিমানের সাহায্য, স্যাটেলাইট এবং উন্নত মডেলিং ব্যবহার করা হয়, বানার্জির পরীক্ষা ছিল প্রাথমিক কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর।
বানার্জির উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা আজও আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ ও জলবায়ু মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
৩. শিক্ষণীয় দিক ও ভবিষ্যতের পরিপ্রেক্ষিত

৩.১ উদ্ভাবনের শিক্ষা
বানার্জির কাজ দেখায় যে বড় বাজেট বা আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াও, সীমিত উপকরণ ব্যবহার করে সৃজনশীল সমাধান সম্ভব।
৩.২ নৈতিক ও পরিবেশগত বিষয়
ক্লাউড-সিডিং নিয়ে বিতর্ক রয়েছে—একদিকে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে পরিবেশে প্রভাব পড়তে পারে। বানার্জির পরীক্ষা এই দিক থেকে পরিপ্রেক্ষিত দেয়।
৩.৩ ইতিহাসের অজানা অধ্যায়
বাংলার বিজ্ঞান ইতিহাসে বানার্জির অবদান এখনও সেভাবে আলোচনায় আসে না। ইতিহাসের এই অধ্যায় জানার মাধ্যমে আমরা দেশীয় উদ্ভাবনের মূল্য বুঝতে পারি।
৩.৪ ভবিষ্যতের প্রয়াস
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, জলব্যালয় সংকট ও বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা বড় সমস্যা। বানার্জির মতো উদ্যোগ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রয়োগযোগ্য সমাধান তৈরি করা সম্ভব।
উপসংহার
১৯৫২ সালে কলকাতার বিজ্ঞানী এসকে বানার্জির কৃত্রিম বৃষ্টির পরীক্ষা শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক চেষ্টা ছিল না; এটি ছিল স্বাধীন চিন্তা, সৃজনশীলতা এবং দেশীয় উদ্ভাবনের নিদর্শন। আজকের দিনে যখন আমরা কৃত্রিম বৃষ্টি এবং আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা করি, বানার্জির উদ্ভাবনী মনোভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের মধ্যে মানুষের সৃজনশীলতা সবচেয়ে মূল্যবান।
আপনিও ভাবুন — আপনার এলাকায় এমন কোনো প্রযুক্তি বা উদ্ভাবন কি আছে যা স্থানীয় সমস্যার সমাধান দিতে পারে? মন্তব্য করুন, শেয়ার করুন এবং এই গল্প অন্যের সঙ্গে জানাতে ভুলবেন না।






