“বারো মাসে তেরো পার্বণ”—এই আপ্তবাক্যের সঙ্গে পরিচিত প্রতিটি বাঙালিই জানেন যে জামাই ষষ্ঠী শুধুমাত্র একটি উৎসব নয়, এটি একটি আবেগ, সম্পর্কের বন্ধনের উদযাপন। তবে অনেকেই জানেন না এই উৎসবের পেছনের চিরন্তন কাহিনি। কেন পালন করা হয় জামাই ষষ্ঠী? কীভাবে এই ব্রতের উৎপত্তি? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
জামাই ষষ্ঠী কী?
জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা পক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে জামাই ষষ্ঠী পালিত হয়। শাশুড়ি মায়েরা এই দিনে জামাইয়ের মঙ্গল কামনায় মা ষষ্ঠীর পুজো দেন এবং বাড়িতে জামাইকে নিমন্ত্রণ করে বিশেষ ভোজের আয়োজন করেন। জামাইয়ের হাতে উঠে আসে ফল, মিষ্টি, নতুন পোশাক ও নানা উপহার। এই দিনটি যেন এক শুভ সম্পর্কের উৎসব।
জামাই ষষ্ঠীর পেছনের কিংবদন্তি
এই ব্রতের পেছনে রয়েছে একটি জনপ্রিয় পুরাণ-কথা—
একসময় এক পরিবারে দুই বউ থাকত। ছোট বউ ছিল ভীষণ লোভী ও ভোজনপ্রিয়। বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলেই, তা চুপিসারে খেয়ে নিত সে। শাশুড়ি যখন জিজ্ঞাসা করতেন খাবার কোথায় গেল, তখন সে দোষ দিত একটা কালো বেড়ালের উপর। কিন্তু সেই বেড়াল ছিল মা ষষ্ঠীর বাহন।
মিথ্যা দোষে অপমানিত হয়ে বেড়ালটি মা ষষ্ঠীর কাছে গিয়ে অভিযোগ করে। রেগে গিয়ে মা ষষ্ঠী ছোট বউকে অভিশাপ দেন—তার সন্তান জন্মের পরেই মারা যাবে। এইভাবে সাত পুত্র ও এক কন্যা হারায় ছোট বউ। অবশেষে বাড়ির লোকেরা তাকে তাড়িয়ে দেয়।
দুঃখে সে বনে গিয়ে কাঁদতে থাকে। তখন মা ষষ্ঠী এক বৃদ্ধার রূপ ধরে তার সামনে আসেন। অনুতপ্ত ছোট বউ মায়ের কাছে ক্ষমা চায়। মা ষষ্ঠী তখন আশীর্বাদ করেন—যদি সে নিষ্ঠাভরে তাঁর পুজো করে, তবে সন্তানদের ফিরে পাবে। ঠিক তেমনটাই ঘটে। এরপর থেকেই মা ষষ্ঠীর পুজো ও জামাই ষষ্ঠীর ব্রত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
জামাই ষষ্ঠী আজকের দিনে
আধুনিক কালে এই ব্রত শুধুমাত্র ধর্মীয় রীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি হয়ে উঠেছে এক সামাজিক বন্ধনের উৎসব। শুধু জামাই নয়, অনেক শাশুড়ি এখন বৌমার মঙ্গল কামনায় “বৌমা ষষ্ঠী” পালন করেন। এটি একভাবে পারিবারিক ঐক্য ও ভালোবাসার প্রতীক।
জামাই ষষ্ঠী উৎসব বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এর পেছনের কাহিনি আমাদের শেখায়—মিথ্যা, লোভ ও অন্যায়ের পরিণাম কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে এবং সত্য ও অনুশোচনার শক্তি কতটা প্রভাবশালী। তাই এই দিন শুধু খাওয়া-দাওয়ার আনন্দই নয়, বরং ঐতিহ্য, ধর্ম ও সম্পর্কের গভীরতা উপলব্ধির দিনও বটে।






