চলে গেলেন হরীশ রানা: ১৩ বছরের লড়াই শেষ, দেশে প্রথমবার কার্যকর হলো ‘নিষ্কৃতিমৃত্যু’

চলে গেলেন হরীশ রানা: ১৩ বছরের লড়াই শেষ, দেশে প্রথমবার কার্যকর হলো 'নিষ্কৃতিমৃত্যু'

নয়াদিল্লি: দীর্ঘ ১৩ বছরের যন্ত্রণাময় প্রতীক্ষার অবসান। দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS)-এ মৃত্যু হলো হরীশ রানার। ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কোনো ব্যক্তিকে ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ বা পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। মঙ্গলবার বিকেলে চিকিৎসকরা তাঁর প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করেন।

দুর্ঘটনার সেই অভিশপ্ত দিন

হরীশ রানার জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল ২০১৩ সালে। চণ্ডীগড় পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির বি.টেক (B.Tech) ছাত্র হরীশ একটি বহুতলের চারতলা থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর চোট পান। সেই থেকে তিনি ছিলেন ‘ভেজিটেটিভ স্টেট’ বা মরণাপন্ন কোমায়। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি শুধু কৃত্রিম উপায়ে নল দিয়ে খাবার এবং মাঝে মাঝে অক্সিজেনের সহায়তায় বেঁচে ছিলেন।

সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়

হরীশের বৃদ্ধ বাবা-মা ছেলের এই অসহ্য যন্ত্রণা আর সইতে না পেরে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। গত ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে হরীশকে সসম্মানে মৃত্যুবরণের অধিকার দেয়। আদালত জানায় যে, হরীশের সুস্থ হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই, তাই কৃত্রিমভাবে তাঁর জীবন টেনে নিয়ে যাওয়া কেবল তাঁর যন্ত্রণাকেই দীর্ঘায়িত করা।

এইমসে নিষ্কৃতিমৃত্যুর প্রক্রিয়া

আদালতের নির্দেশে গত ১৪ মার্চ হরীশকে গাজিয়াবাদের বাড়ি থেকে দিল্লির এইমসের প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের একটি বিশেষ বোর্ড ধাপে ধাপে তাঁর লাইফ সাপোর্ট এবং কৃত্রিম পুষ্টি ব্যবস্থা (Feeding Tube) সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই প্রক্রিয়ার সময় হরীশের পরিবার তাঁর পাশেই ছিল। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁর মা চোখের জলে ছেলেকে শেষ বিদায় জানাচ্ছেন।

‘রাইট টু ডাই উইথ ডিগনিটি’ বা মর্যাদাপূর্ণ মৃত্যুর অধিকার

হরীশ রানার এই মামলাটি ভারতের চিকিৎসা এবং আইনি ক্ষেত্রে এক বড় মাইলফলক। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট ‘লিভিং উইল’ এবং মর্যাদাপূর্ণ মৃত্যুকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, হরীশের ক্ষেত্রেই তা প্রথম বাস্তবায়িত হলো।

একনজরে হরীশ রানা মামলা:

  • দুর্ঘটনা: ২০১৩ সালে চণ্ডীগড়ে চারতলা থেকে পতন।
  • শারীরিক অবস্থা: ১৩ বছর ধরে কোমায় (Vegetative State)।
  • আদালতের রায়: ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি।
  • মৃত্যু: ২৪ মার্চ ২০২৬, এইমস দিল্লি।

হরীশ রানার চলে যাওয়া কেবল একটি জীবনের অবসান নয়, বরং ভারতের আইন ব্যবস্থায় “সম্মানের সাথে বিদায় নেওয়ার” অধিকারের এক বাস্তব প্রয়োগ।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
Email
Print
আরও পড়ুন
error: Content is protected !!