কলকাতা: কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির পর নিম্নচাপের মূল কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরে ঝাড়খণ্ডের দিকে এগোলেও বাংলার আকাশ থেকে এখনই বর্ষার দাপট কাটছে না। ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঝাড়খণ্ডের উপর থাকা ডিপ্রেশনটি পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে দুর্বল হয়ে সুস্পষ্ট নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। এর প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় আগামী কয়েকদিন বৃষ্টি ও বজ্রবিদ্যুৎ চলবে।
১৮ আগস্টের বিশেষ বুলেটিনে কলকাতা আঞ্চলিক আবহাওয়া কেন্দ্র জানিয়েছিল, সিস্টেমটি ঝাড়খণ্ড ও সংলগ্ন গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের উপর অবস্থান করছিল এবং পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ঝাড়খণ্ড-বিহারের উপর দিয়ে পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। একই সময়ে দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির কার্যকলাপ বাড়ার কথাও জানানো হয়।
কলকাতায় এক মাসে ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি
এই নিম্নচাপের প্রভাবে কলকাতায় গত ৪৮ ঘণ্টায় ৭৫ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছে। ১৮ আগস্ট সন্ধ্যা পর্যন্ত অগস্ট মাসে শহরের মোট বৃষ্টির পরিমাণ পৌঁছয় ৩৬৩.৭ মিলিমিটারে। জুনে ৩৬৭.৬ মিলিমিটার এবং জুলাইয়ে ৩২৬ মিলিমিটার বৃষ্টির পরে অগস্টেও ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হওয়ায় চলতি বর্ষায় কলকাতায় টানা তিন মাসেই এই মাত্রার বৃষ্টির নজির তৈরি হয়েছে।
প্রাপ্ত দীর্ঘমেয়াদি তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর কলকাতায় জুন, জুলাই ও অগস্ট—এই তিন মাসেই ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাতের ঘটনা আগে চারটি বছরে দেখা গিয়েছিল। সেই তালিকায় ছিল ২০০২, ২০০৮, ২০১৩ এবং ২০২০ সাল। ২০২৬ সালে ফের একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পশ্চিম বর্ধমানে বৃষ্টির নজির
নিম্নচাপের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব দেখা গিয়েছে পশ্চিম বর্ধমানে। ১৮ আগস্টের IMD পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বার্নপুরে ২৪ ঘণ্টায় ২২ সেন্টিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। আসানসোলের কেন্দ্রীয় জল কমিশনের বৃষ্টিমাপক যন্ত্রে ১৭ সেন্টিমিটার এবং আসানসোল শহরে ১৬ সেন্টিমিটার বৃষ্টির হিসাব পাওয়া যায়।
এর মধ্যে বার্নপুরের ২২ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত অগস্ট মাসে ওই এলাকায় ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য রেকর্ড তৈরি করেছে। আসানসোলেও এই বৃষ্টি অতীতের অগস্টের নজিরগুলির তুলনায় ব্যতিক্রমী।
বাড়ছে দুর্গাপুর ব্যারাজ থেকে জল ছাড়ার পরিমাণ
অতিরিক্ত বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে দামোদর অববাহিকাতেও। দুর্গাপুর ব্যারাজ থেকে জল ছাড়ার পরিমাণ ধাপে ধাপে বেড়েছে। প্রবল বৃষ্টির জেরে বিভিন্ন নদী ও খাল দিয়ে অতিরিক্ত জল দামোদরে এসে পড়ায় ব্যারাজের উপর চাপ বেড়েছে।
তবে ডিভিসির তরফে জানানো হয়েছিল, মাইথন ও পাঞ্চেতে জল ধরে রাখার যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে এবং পরিস্থিতি থেকে আপাতত বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই। পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে।
১৯ থেকে ২৩ আগস্টও বৃষ্টি চলবে
নিম্নচাপের কেন্দ্র সরে গেলেও মৌসুমি অক্ষরেখা ও বাতাসে পর্যাপ্ত জলীয়বাষ্পের কারণে দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। IMD-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট দক্ষিণবঙ্গের সব জেলাতেই হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি বা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান ও বীরভূমের এক-দু’টি জায়গায় ভারী বৃষ্টিও হতে পারে।
১৯ থেকে ২০ আগস্টের মধ্যেও দক্ষিণবঙ্গের বহু জায়গায় বৃষ্টি হতে পারে। ঝাড়গ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া এবং কলকাতায় বজ্রপাত ও ঘণ্টায় প্রায় ৩০-৪০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০ থেকে ২১ আগস্টেও কয়েকটি জেলায় একই ধরনের আবহাওয়া বজায় থাকতে পারে।
IMD-এর জাতীয় বুলেটিনেও ১৯ আগস্ট ঝাড়খণ্ডে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা এবং ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতা রয়েছে।
অর্থাৎ, নিম্নচাপের কেন্দ্র বাংলা ছেড়ে গেলেও তার প্রভাব একেবারে শেষ হয়নি। কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের বাসিন্দাদের আগামী কয়েকদিন বজ্রবিদ্যুৎ, জল জমা এবং দমকা হাওয়ার পরিস্থিতিতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।







