নিজস্ব প্রতিবেদন: ভারতীয় সঙ্গীতের আকাশ থেকে খসে পড়ল আরও একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। ৯২ বছর বয়সে চিরবিদায় নিলেন আশা ভোঁসলে। কেবল একটি কণ্ঠ নয়, তিনি ছিলেন এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। তাঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্য এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাহস তাঁকে সমসাময়িক সবার থেকে আলাদা করে রেখেছিল।
সুরের বহুমুখী ধারা: যেখানে আশা অনন্য
আশা ভোঁসলের গানের জগৎ ছিল এক বিশাল মহাসাগরের মতো। তাঁর গায়কীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ‘ভার্সাটাইল’ বা বহুমুখী হওয়া। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, একই শিল্পী যেমন চঞ্চল পপ গান গাইতে পারেন, তেমনই গভীর শাস্ত্রীয় বা বিরহী গজলও গাইতে পারেন।
- ও.পি. নায়ার ও ‘চুলবুলি’ আশা: পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ও.পি. নায়ারের সুরে তিনি উপহার দেন ‘ঝুমকা গিরা রে’ বা ‘আইয়ে মেহেরবান’-এর মতো গান। এই গানগুলোয় তাঁর কণ্ঠের এক অদ্ভুত মাদকতা ও স্মার্টনেস শ্রোতাদের পাগল করে তুলেছিল।
- আর.ডি. বর্মন ও আধুনিকতার বিপ্লব: রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গে তাঁর জুটি সঙ্গীত জগতে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। ‘দম মারো দম’ (হরে কৃষ্ণ হরে রাম) বা ‘পিয়া তু আব তো আজা’ (কারাভান) গানে তিনি পশ্চিমা পপ ও জ্যাজ ঘরানাকে ভারতীয় সংগীতে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। আবার এই জুটিরই ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’ আজও রোমান্টিক গানের তালিকায় শীর্ষে।
- গজল ও ধ্রুপদী ছোঁয়া: উমরাও জান (১৯৮১) ছবিতে খৈয়াম-এর সুরে গজল গেয়ে তিনি বিশ্বকে চমকে দেন। ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’ বা ‘ইন আঁখো কি মস্তি’ শুনে বোঝা কঠিন ছিল যে এই গায়িকাই আবার ‘ও হাসিনা জুলফোওয়ালি’ গেয়েছেন। এখানেই ছিল তাঁর মুন্সিয়ানা।
বাংলা গানের অমর আখ্যান
বাঙালির আবেগের সাথে আশা ভোঁসলের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং আর.ডি. বর্মনের সুরে তাঁর গাওয়া বাংলা গানগুলো আজও ঘরোয়া আড্ডার প্রধান অনুষঙ্গ।
- কালজয়ী কিছু গান: ‘গাইছে আকাশ গাইছে বাতাস’, ‘মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ’, ‘কথা দিয়ে এলে না’, কিংবা সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুরে ‘জানি না এখন কোথায় তুমি’— তাঁর প্রতিটি গানে ছিল নিখুঁত বাংলা উচ্চারণ এবং অনন্য দরদ।
সংগ্রাম ও উত্তরণের গল্প
লতা মঙ্গেশকরের মতো এক হিমালয়সম প্রতিভার ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করা সহজ ছিল না। শুরুর দিকে তাঁকে দেওয়া হতো কেবল সেই গানগুলো যা অন্য কেউ গাইতে চাইতেন না। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জকেই তিনি সুযোগে পরিণত করেন। দিদি লতা যেখানে ‘স্থিরতা’ ও ‘পবিত্রতা’র প্রতীক ছিলেন, আশা সেখানে হয়ে ওঠেন ‘গতি’, ‘আধুনিকতা’ ও ‘সাহসী’ গায়কীর প্রতীক।
গিনেস রেকর্ড ও স্বীকৃতি
- বিস্ময়কর পরিসংখ্যান: তিনি ২০টিরও বেশি ভাষায় ১১,০০০-এর বেশি গান গেয়েছেন। ২০১১ সালে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথিবীর সবথেকে বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
- পুরস্কার: ভারত সরকার তাঁকে ২০০০ সালে ‘দাদাসাহেব ফালকে’ এবং ২০০৮ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে। এছাড়াও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে অজস্র ফিল্মফেয়ার ও লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।
সুরের ইন্দ্রজাল রয়ে গেল…
মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি অমর। আশা ভোঁসলে কেবল একজন গায়িকা হিসেবে নয়, বরং একজন যোদ্ধা হিসেবেও আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সোনালী যুগের একটি বিশাল স্তম্ভ ভেঙে পড়ল। মুম্বাইয়ের আকাশ আজ বিষণ্ণ, কিন্তু সেই সুর আজও বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে— “আভি না যাও ছোড়কর, কে দিল আভি ভরা নেহি…”
শ্রদ্ধাঞ্জলি: এক সুরসম্রাজ্ঞীর মহাপ্রস্থান।






